সৃষ্টির মৌন কবিতা: নারী ও ফুল

তাশরীফ আহমদ

উসমান বিন আবদুল আলিম
পড়তে লাগবে 7 মিনিট

নারী আর ফুল—দু’জনেই স্রষ্টার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। একজন হৃদয়ের ধ্বনি, আরেকজন নিসর্গের নিঃশব্দ দোয়া। দুই সত্তাই কোমলতা আর সৌন্দর্যের নিবিড় প্রতীক, তবু তারা কেবল বাহ্যিক শোভায় সীমাবদ্ধ নয়; বরং তারা পৃথিবীর গভীরতম স্বরাষ্টীয় রহস্য বয়ে আনে, এনে দেয় প্রাণ ও প্রীতির কাব্যিক অনুরণন। ফুল ফোটে অপরাহ্নে, ঝরে যায় রাতের গোপন দীর্ঘশ্বাসে, অথচ তার রঙের অন্তরালে যে পবিত্র আলো থাকে, তা থেকে যায় শত শত হৃদয়ে। অন্যদিকে নারী—তিনি আদি থেকেই ইতিহাসের মৌল আবর্তন, তাঁর শরীর ও হৃদয় জুড়ে লেখা থাকে সৃষ্টি-সংরক্ষণ-শিল্প ও সম্পৃক্ততার দীর্ঘ মহাকাব্য। সন্তানকে প্রথম কাঁধে তোলার মুহূর্তে তিনি হয়ে ওঠেন মাটির উর্বরতা; প্রিয়জনের ক্লান্ত ভ্রু ছুঁয়ে দেন মৃদু হাতছানিতে—হঠাৎই যেন আকাশ মেঘমুক্ত হয়ে ওঠে। তাই নারী ও ফুল মূলত একে অপরের প্রতিবিম্ব: ফুলের সৌন্দর্যে যে নীরব আহ্বান, নারীর হাসিতে ঠিক সেই একই নরম আলো।

শিশু যখন মুখে প্রথমবার ‘মা’ শব্দটি উচ্চারণ করে, আকাশের সমস্ত পাখির ডাক থেমে যায়, বাতাস স্থির হয়ে শোনে সেই কণ্ঠের ডেকে জন্ম নেওয়া অনাদি সুর। সে মুহূর্তে নারী হয়ে ওঠেন প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়, প্রথম আদর্শ, প্রথম ভালোবাসা, প্রথম নিরাপত্তার দুর্গ। আবার যখন কোনো অবেলায় বাগানের গোলাপ নিজেকে খুলে দেয়, তার সুবাসে ঘুম ভাঙে বিষণ্ন প্রজাপতির; তখন বুঝি ফুলও কথা বলে—সে বলে, ‘ভালোবাসা হতে হয় বিনিময়হীন।’ ফুল যে ভাষায় কথা বলে, নারী সেই ভাষাকেই রূপ দেন আচরণের মাধুর্যে, হাসিতে, চোখের উষ্ণ জলে, কখনো বা নীরব আত্মদানে।

কিন্তু আমাদের সমাজ প্রায়শই এ দুই সৌন্দর্যের নদীকে বোঝে না। ফুলকে আমরা শোভা বলেই জানি, তার পেছনে যে সূক্ষ্ম শিরা বেয়ে জল ওঠে—সেটি অনুভব করি না। নারীকেও দেখি সামাজিক ভূমিকার খাঁচায়—কখনো গৃহিণী, কখনো কর্মজীবী, কখনো আবার ‘দুর্বল শ্রেণি’ ইত্যাদি উপাধিতে। অথচ নারী হলো সময়ের শিকড় ও আগুনের শিখা; তাঁর ভেতর অন্ধকার জমে উঠলেও তিনিই আলো জ্বালেন, তাঁর কণ্ঠে প্রশ্ন থাকলেও প্রথমে উত্তর দেন অন্যের প্রশ্নের। ফুলের পাপড়ি নিঃশব্দে ঝরে গেলে গাছ ক্ষণিক কাঁপে; নারীর চোখের জল ঝরে গেলে কাঁপে একটি পরিবার, ভেঙে পড়ে সমাজের স্বপ্নের আরশি।

আরো বিস্তারে গেলে, ফুলের সৌন্দর্য কেবল চোখের ভোজ নয়; তা এক জন্মগত প্রতিরোধ। খরা কিংবা ঝড়—যাই আসুক, ফুল ক্ষণিকের জন্য হলেও নিজেকে মেলে ধরে, যেন বলে, ‘সৌন্দর্য হলো দৃঢ়তার অন্য নাম।’ নারীর জীবনও তেমন দ্বৈত স্রোত: আর্দ্র কোমলতার পাশাপাশি আছে প্রস্তর দৃঢ়তা। তিনি সন্তানের আঙুল ধরে হাঁটতে শেখান, অথচ লড়তে শেখেন একলা রাতে, যখন গৃহস্থালির কাজের শেষে নিজের নীরব স্বপ্নগুলোকে জাগিয়ে রাখেন দীপশিখার মতো। তাঁর সমস্ত অর্জন লেখা থাকে অদৃশ্য কেতাবের পাতায়, অনেকটা ফুলের সুবাসের মতো—দূরের কেউ টের পায়, কিন্তু চোখে দেখা যায় না।

প্রতিটি ফুলের পেছনে যেমন থাকে মাটি, পানি, সূর্যের গোপন আদালত, প্রতিটি নারীর সাফল্যপথেও থাকে অনুজ্জ্বল ত্যাগের সমুদ্র। এক বালিকাকে শিক্ষিতা নারী হতে সময় লাগে বছরের পর বছর, তার বিপরীতে সমাজের বদলে যাওয়া মনোভাব লাগে শতাব্দী। সেই নারীর হাতে খেলনার বদলে বই তুলে দিয়ে, তার স্বপ্নকে বাঁধতে না গিয়ে ডানা মেলে দিলে, সে হয়ে ওঠে পৃথিবীর এক অনন্য কাব্যগ্রন্থ। ঠিক তেমনি, বাগানে যখন বীজ পোঁতা হয় যত্ন আর অপেক্ষার জলে, তখন অঙ্কুরে ফেটে ওঠে রঙিন বারতা—প্রকৃতির জগন্নাথ-রথ।

নারী ও ফুলের আরেকটি অপনেয় সাদৃশ্য হলো তাদের মুহূর্তজীবী মহিমা। ফুলের সৌন্দর্য, সুবাস—সবকিছু সাময়িক; তবু সেই মুহূর্ত থাকে চিরস্থায়ী স্মৃতিতে। নারীর হাসিও তেমন—হয়তো দিনের শেষে ক্লান্তিতে মুছে যায়, তবু সেই হাসি জন্ম দেয় হাজার বছরের উজ্জ্বল অনুপ্রেরণা। কেউ একজন অচেনা নারীর সহায়তায় কখনো স্কুলে ভর্তি হয়েছিল—সে গল্প থেকে জন্ম নেয় দাতা-সংস্থার বিস্ময়কর উদ্যোগ। কোনো কিশোরী সাইকেলে পাড়ি দেয় অজস্র গ্রাম—সেখানে জ্বলে ওঠে নতুন আলো, বদলে যায় মানচিত্রের রং।

সভ্যতার শুরু থেকে কবি ও শিল্পীরা এ দুই সত্তাকে আপন ক্যানভাসে এঁকেছেন—কখনো কৃষ্ণচূড়ার কাছে নারীর ঠোঁট, কখনো রজনীগন্ধার সাদা আলোয় নারীর মন, আবার কখনো কাঁটায় ঢাকা গোলাপের প্রতিরোধে নারীর শিখা। কেউ লিখেছেন, ‘নারী কবিতার মতো—বোঝা যায় না, শুধু অনুভব করা যায়।’ আরেকজন বলেছেন, ‘ফুল যেমন রঙ দেয়, নারী তেমন অর্থ দেয়।’ প্রকৃত দর্শন হলো—এই দুই সৃষ্টি আলাদা নয়; তারা একই সৌন্দর্যের দুই অধ্যায়, দুটি অবগাহন, দুই পথ, যাদের শেষ মিলন ঘটে সৃষ্টিকর্তার প্রশান্ত কণ্ঠে।

আমরা যখন কোনো ফুল উপড়ে নষ্ট পারফিউমের জলে ভাসিয়ে দিই, সেই ফুলের মৃত্যু আমাদের মনুষ্যত্বেরই ক্ষয়; তেমনি নারীর স্বপ্ন ছিঁড়ে দিলে ভেঙে যায় ভবিষ্যতের একটা সম্ভাব্য মহাবৃক্ষ। তাই বলা উচিত: ফুলকে ছিঁড়ো না—তার সৌন্দর্য বাঁচতে দাও; নারীর সম্ভাবনাকেও ছিঁড়ো না—তার ডানা মেলতে দাও। ফুল যতদিন বাঁচে, সে সুগন্ধ বিলায়; নারী যতদিন বাঁচে, সে মানবতা বিলায়। একটি ছেঁড়া ফুল আর একটি ভাঙা নারীর আর্তনাদ হয়তো কানে আসে না, কিন্তু বিশ্বজোড়া নিস্তব্ধতায় তার অনুরণন বাজে অন্তহীন।

মানুষের চোখ যদি কেবল বাহ্যিক অভিজ্ঞানেই তৃপ্ত, তবে সে ফুলের গন্ধ হারায়, নারীর মন হারায়; তখন পৃথিবীর রং ফিকে হয়, বাতাস হয় বিষণ্ন। ফুলকে বাঁচাতে হলে রাখতে হয় জলভরা টবের ভিজে মাটিতে; নারীকেও বাঁচাতে হলে রাখতে হয় সম্মান ও সমকালের রৌদ্রছায়ায়। সভ্যতার যে কোনো বৃহৎ সাফল্য—চাঁদে মানুষের পা, কিংবা কবিতায় প্রেমের নতুন সংজ্ঞা—পেছনে থাকে অগণিত নারীর উৎসাহ অথবা কোনো বাগানের ক্ষুদে ফুলের প্রেরণা।

এই প্রবন্ধের অনন্ত পঙক্তিতে তাই পুনর্বার উচ্চারণ করি: নারী ও ফুল—দু’জনেই স্রষ্টার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। তারা একে অপরের প্রতিবিম্ব, একে অপরের অসম্পূর্ণ বাক্য। নারীর কোমলতা ফুলকে অর্থ দেয়, ফুলের সৌন্দর্য নারীকে রঙিন করে। তাদের প্রতি সম্মান জানানো মানে কেবল রক্ষণশীল ভক্তি নয়, বরং সভ্যতার আদি ঋণ শোধ করা। মা, বোন, স্ত্রী, কন্যা কিংবা বন্ধুর ভিন্ন ভিন্ন পরিচয়ে নারী যখন পাশে থাকে, তখন দৈনন্দিন ক্লান্তি আশ্চর্যজনকভাবে হালকা লাগে; যখন জানালার ধারে একটি মাত্র জুঁইফুল ফোটে, তখন ঘরের নিঃশ্বাস পর্যন্ত পবিত্র হয়। এই দুই সত্তা আমাদের মনকে শিক্ষা দেয়—আলো আসলে আসে ভিতর থেকে, আর সেই আলোকে টিকিয়ে রাখে কোমলতা।

সেই ভাষা বোঝার জন্য দরকার মৃদু শ্রুতিতে কান পাতার ক্ষমতা, হৃদয়ে অস্পষ্ট শব্দের প্রতিধ্বনি শোনার ধৈর্য। কারণ আমরা যখন নারীর গল্প শুনি, ফুলের গন্ধ নিঃশ্বাসে টেনে নিই—ঠিক তখনই বুঝতে পারি, ‘কোমল’ মানে ‘দুর্বল’ নয়; বরং কোমলতার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে নীরব দৃঢ়তার মূলধন। যদি কোনো কিশোর তার বইয়ের ভাঁজে শুকনো গাঁদাফুল রাখে, সে আসলে স্মৃতিকে বন্দি করে রাখে; যদি কোনো বৃদ্ধা দাদি রোজ সন্ধ্যায় জানালার গ্রিলে কৃষ্ণচূড়া গুঁজে দেন, তিনি তাঁর বৃথা হয়ে যাওয়া বয়সও সাহচর্যের সুবাসে ভিজিয়ে রাখেন। এই ছোট ছোট আচারগুলোই প্রমাণ করে—নারী ও ফুল আমাদের অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্যচেতনাকে জাগিয়ে রাখে, মানুষকে না-বলা দোয়া শেখায়, জীবনকে অনুভূতির জলে ধুয়ে পবিত্র করে। তাই পুরনো সমাজব্যবস্থা ভাঙতে হলেও, নতুন ভবিষ্যৎ গড়তে হলেও—দুয়োটারই সূচনা হয় একটি ফুলের বীজ এবং একজন নারীর স্বপ্ন থেকে। আসুন, আমরা দু’জনেরই হাতে তুলে দিই যত্ন ও সম্মানের তাজা জল; সেখান থেকেই অঙ্কুরিত হবে আগামী দিনের সবচেয়ে মধুর ও টেকসই সৌন্দর্য

লেখক ও শিক্ষক

শেয়ার করুন
উসমান বিন আবদুল আলিম একজন উদীয়মান ইসলামি চিন্তাবিদ, গবেষক ও লেখক। তরুণ বয়সেই তিনি ইসলামের বিভিন্ন শাখায় জ্ঞানার্জন ও গবেষণায় মনোনিবেশ করেন। কুরআন, হাদীস, ইসলামি দর্শন ও ইতিহাসের ওপর তাঁর গভীর অন্তর্দৃষ্টি এবং চিন্তাশীল লেখনিতে তরুণ প্রজন্মের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। ইসলামি মূল্যবোধ ও আধুনিক চিন্তার সমন্বয় ঘটিয়ে তিনি একটি সময়োপযোগী দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করছেন, যা বর্তমান প্রজন্মকে ইসলামের প্রকৃত সৌন্দর্য বুঝতে সহায়তা করে। পাশাপাশি, তিনি নিয়মিত বিভিন্ন পত্রিকা ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে লেখালেখি করছেন — যেখানে ইসলামের মৌলিক শিক্ষা, আত্মউন্নয়ন এবং সমাজ সংস্কারের বিষয়ে তার বিশ্লেষণ প্রশংসিত হচ্ছে।
মন্তব্য নেই

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।