মানুষের জীবন এক অদ্ভুত যাত্রা। শুরু হয় কান্নায়, শেষ হয় নীরবতায়। মাঝের সময়টুকু জুড়ে থাকে হাসি, প্রিয়জন, সম্পর্ক, সাফল্য আর ব্যস্ততা। কিন্তু এই যাত্রার একসময় এসে মানুষ বুঝতে পােও, পৃথিবীর সব সঙ্গই সাময়িক, সব সম্পর্কই শর্তসাপেক্ষ। একমাত্র সঙ্গী হচ্ছে নিজের নিঃসঙ্গতা।
যতদিন শরীর সচল থাকে, মুখে প্রাণচাঞ্চল্য থাকে, ততদিন সবাই পাশে থাকে। বন্ধু আত্মীয় সবাই আপনার চারপাশে ঘুরে বেড়ায়, আপনার উপস্থিতিতে জীবনের উচ্ছ্বাস খুঁজে নেয়। কিন্তু শরীর যখন ভেঙে পড়ে, অসুস্থতা যখন আপনাকে বিছানায় বেঁধে ফেলে, তখন পৃথিবীর রঙ ফিকে হয়ে আসে। আপনি তখন দেখবেন, যাদের জন্য এত পরিশ্রম করেছেন, যাদের সুখের জন্য নিজের আনন্দ বিসর্জন দিয়েছেন, তারাই ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে।
প্রথমে ফোন আসে, বার্তা আসে— “চিন্তা করবেন না, ইনশা’আল্লাহ ভালো হয়ে উঠবেন।” তারপর সেই ফোনও বন্ধ হয়ে যায়। যে মানুষগুলো একসময় নিয়মিত আপনার বাড়িতে আসত, তারা এখন ব্যস্ত হয়ে পড়ে নিজের জীবনে। ভাই—বোন, আত্মীয়, বন্ধু সবাই যেন এক নতুন ব্যস্ততার জগতে হারিয়ে যায়। যেখানে আপনার নামের জায়গা খুবই ক্ষীণ।
অসুস্থতা মানুষকে শুধু শারীরিকভাবে নয়, মানসিকভাবেও দুর্বল করে। তবুও, এই সময়েই মানুষ জীবনের সবচেয়ে সত্য পাঠটি শেখে— এই পৃথিবীতে আপনি ছাড়া কেউই আপনার নয়। তখন নিজের যত্ন নেওয়া, নিজের মানসিক শক্তি ধরে রাখা, এটাই আসল সংগ্রাম। কারণ কেউ এসে আপনার কষ্টকে ভাগ করে নেবে না; কেউ এসে আপনার নিঃসঙ্গতা দূর করবে না।
সবাই আপনাকে ভালোবাসবে, যতক্ষণ আপনি তাদের কাজে লাগবেন; আপনি একবার অচল হয়ে গেলে, ভালোবাসাও আপনাকে এড়িয়ে চলে যাবে।
দিনের পর দিন, সপ্তাহের পর সপ্তাহ কেটে যায়। জানালার বাইরে সূর্য ওঠে, পাখি ডাকে, শিশুরা হাসে, সবকিছু আগের মতোই চলে। আপনার নিস্তব্ধ ঘরে তখন বাজে ওষুধের বোতলের শব্দ, আর রাতের গভীরে শোনা যায় নিজের শ্বাসের ভারী ছন্দ।
একসময় মানুষ এই নিঃসঙ্গতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে শেখে। অতীত এসে বসে তার পাশে, যে সকালগুলোতে হাসি ছিল, যে বিকেলগুলোতে স্বপ্ন ছিল, সব একে একে ফিরে আসে স্মৃতির পাতায়। মন তখন বুঝে যায়, জীবন আসলে ছিল এক ক্ষণস্থায়ী স্বপ্ন, যার কোনো স্থায়ী রূপ নেই, নেই নিশ্চিত প্রতিশ্রম্নতি। আর তারপর আসে এক নীরব সকাল। শরীর আর সাড়া দেয় না, চোখ ভারী, নিঃশ্বাস ক্ষীণ। চারপাশে হয়তো কেউ নেই, হয়তো আছে, কিন্তু মন তখন আর কারও দিকে তাকায় না। মন তখন কেবল একটি কথাই বলে— “হে আল্লাহ, এবার নিয়ে যান, কষ্ট আর সহ্য হয় না।”
আর তখনই শুরু হয় শেষ যাত্রা। ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ হয়ে আসে, সমস্ত ব্যথা মুছে যায় এক শান্ত নিস্তব্ধতায়। শরীর পড়ে থাকে, কিন্তু আত্মা মুক্ত হয়ে যায়। পৃথিবী তখনও একইভাবে ঘুরে চলে— মানুষ কাজ করে, হাসে, গল্প করে; কেউ হয়তো আপনার জন্য কাঁদে কিছুদিন, তারপর আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যায়। তবুও কিছু থেকে যায়—আপনার প্রার্থনা, আপনার দোয়া, আপনার একটুখানি সৎ কাজ। সেই কাজ, সেই দোয়া হয়তো কোনো এক অপরিচিত মানুষের জীবনে আলো হয়ে জ্বলে ওঠে।
অসুস্থতা মানুষকে ভেঙে দেয়, কিন্তু সেই ভাঙনের মধ্য দিয়েই মানুষ শিখে নেয় জীবনের গভীরতা। এটি শেখায়, সম্পর্ক নয়, আত্মার শান্তিই চূড়ান্ত। আর শেষে যখন মানুষ পৃথিবী ছেড়ে যায়, সে শুধু অসুস্থতার ভার নিয়েই যায় না, নিয়ে যায় জীবনের সব অভিজ্ঞতা, সব স্মৃতি আর জমে থাকা সব ব্যথা। রেখে যায় কিছু ভালোবাসা, যা হয়তো কোনো একদিন কারও মনে আলো ছড়াবে নিঃশব্দে। শেষমেশ, সবাই একদিন অসুস্থতা নিয়ে, নিঃসঙ্গতা বুকে নিয়ে,
নিঃশব্দে এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যায়। কিন্তু যারা পৃথিবীতে ভালো কিছু রেখে যায়, তাদের চলে যাওয়া কখনো পূর্ণ হয় না, তারা থেকে যায় মানুষের দোয়া ও স্মৃতিতে, অদৃশ্য অথচ অমর হয়ে।
মোহাম্মদপুর, ঢাকা।
নিঃসঙ্গতার শেষ প্রহর
তাশরীফ আহমদ
উসমান বিন আবদুল আলিম একজন উদীয়মান ইসলামি চিন্তাবিদ, গবেষক ও লেখক। তরুণ বয়সেই তিনি ইসলামের বিভিন্ন শাখায় জ্ঞানার্জন ও গবেষণায় মনোনিবেশ করেন। কুরআন, হাদীস, ইসলামি দর্শন ও ইতিহাসের ওপর তাঁর গভীর অন্তর্দৃষ্টি এবং চিন্তাশীল লেখনিতে তরুণ প্রজন্মের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
ইসলামি মূল্যবোধ ও আধুনিক চিন্তার সমন্বয় ঘটিয়ে তিনি একটি সময়োপযোগী দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করছেন, যা বর্তমান প্রজন্মকে ইসলামের প্রকৃত সৌন্দর্য বুঝতে সহায়তা করে। পাশাপাশি, তিনি নিয়মিত বিভিন্ন পত্রিকা ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে লেখালেখি করছেন — যেখানে ইসলামের মৌলিক শিক্ষা, আত্মউন্নয়ন এবং সমাজ সংস্কারের বিষয়ে তার বিশ্লেষণ প্রশংসিত হচ্ছে।
মন্তব্য নেই