দীর্ঘ তেরো বছর আমার জীবনের ‘শিক্ষা বসন্ত’। এই তেরো বছর গত হয়েছে একাধিক মাদরাসায়। শতাধিক উস্তাদের সান্নিধ্য লাভে ধন্য হয়ে। তাদের সকলেই শ্রদ্ধার আর ভালোবাসার। কিন্তু পুষ্প কাননে যেমন অনেক ফুল থাকে, সবগুলোই দেখতে সুন্দর, কিন্তু অনেক ফুলের মাঝেও কোনো কোনোটা হয় একটু ভিন্ন, রঙে বা সুবাসে। তেমনই কোনো কোনো উস্তাদ হোন আচরণে বা উচ্চারণে অন্যদের চেয়ে মহান। অনন্য। আজ যখন স্মৃতিকথা লিখতে বসেছি, জীবনের এলবামে তাদের সোহবতে কাটানো শত—সহস্র স্মৃতিদের ভিড় জমে উঠেছে। তবু আমি তাদের স্বরণে সেসব থেকে যতসামান্যই উল্লেখ করব।
১.
তখন নির্দোষ আনন্দের ছেলেবেলা। সবেমাত্র শিক্ষাজীবনের হাতেখড়ি। স্কুলে পড়ার পাশাপাশি বাসাতেই মক্তব পড়ি। এখনও মনে আছে, যেদিন আব্বু সাথে করে হুজুরকে নিয়ে এসেছিলেন বাসায়, প্রথম দেখাতেই তাকে আমার ভালো লেগে যায়। শ্রদ্ধায় মাথাটা নুয়ে আসে। রাশভারী চেহারা, কালো দাড়ি আর পরিষ্কার—পরিচ্ছন্ন জুব্বায় হুজুরকে বেশ মানায়। তিনি হেসে হেসে আদর করে পড়াতেন আলিফ, বা, তা…। ধৈর্য সহকারে বারবার বলতেন। পড়ানোর সময়ই মুখস্থ হয়ে যেত। মাঝে মাঝে কপট রাগ দেখাতেন। মনে পড়ে, কখনোই তিনি হাত তোলেননি আমার গায়ে। তখনই কচি মনে অনুভব করেছিলাম একজন শিক্ষক কীভাবে পিতার শাসন আর মায়ের সোহাগ এক করে পড়ান। হুজুরের মায়া, মমতা আজও ভুলতে পারিনি। কখনো ভুলতে পারব না। সেই মক্তব পড়েছি হুজুরের কাছে। তারপর সাক্ষাৎও হয়নি আর, কিন্তু অতীত হাতড়ালে প্রিয় উস্তাদের কথা মনে পড়ে। এখনও চোখের পাতা বন্ধ করলে হুজুরের কান্তিময় চেহারা জলছবির মতো ভেসে ওঠে।
২.
তারপর যখন একটু বড় হই। মাত্র শৈশবের গণ্ডি পেরিয়ে কৈশোরে পা রাখি। তখন পিতা—মাতা আর প্রিয়মুখ, সবকিছু ছেড়ে সুদূর চাঁদপুরে পড়তে যাই, তখন যিনি আমাকে একই সাথে বাবার শাসন আর মমতাময়ী মায়ের ভালোবাসা দিয়ে বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখান, তিনি হলেন চাঁদপুরের বিখ্যাত মাদরাসা মুমিনপুরের মুহতামিম সাহেব। খালেদ মুহসিন সাহেব রাহিমাহুল্লাহ। আমার জীবনে যার অবদান অনস্বীকার্য।
তিনি আদর, সোহাগ করে আনন্দ দিয়ে পড়াতেন। টার্গেট দিয়ে দিয়ে পড়াটা চটজলদি আদায় করে নিতেন। ফলে অবিশ্বাস্যভাবেই মাত্র পাঁচ মাসে তার কাছে কুরআনের নাজেরা শেষ করে ফেলি।
আমি হুজুরের কাছে নাজেরা পড়তাম। অথচ হুজুর একদিন ডেকে বললেন ‘চার পারার আঠারো নাম্বার পৃষ্ঠাটা মূখস্থ করে শুনাও।’ আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। তখনকার অবুঝ দিনে হাজারো শ্রম্নতিকথার মধ্যে কীভাবে যেন আমি এটাও জানতামÑকুরআনের এই পৃষ্ঠাটা সবচেয়ে কঠিন। আমাকে আমতা—আমতা করতে দেখে হুজুর সাহস দিলেন। অভয় বাণী শোনালেন। আমিও আশা ও সাহস পেয়ে পৃষ্ঠাটি মুখস্থ করে শুনিয়ে ফেললাম। সেদিন হুজুর খুশি হয়ে বলেছিলেন ‘এই তো তুমি হাফেজ হওয়ার সার্টিফিকেট পেয়ে গেলে।’ তখন বুঝিনি। আজ বুঝি, আমার ছোট্ট মনে সাহস জোগানোর জন্য ওই কথাটার বড্ড প্রয়োজন ছিল।
আবার পড়া না পারলে তিনি কঠিন হয়ে যেতেন। ভীষণ রেগে যেতেন। এক দিনের ঘটনা। শীতের সকাল। মাদরাসা নদীর তীরঘেঁষে হাওয়ায় শীত যেন একটু বেশিই, সেদিন পড়া পারিনি, হুজুর রাগ করে শাস্তি দিলেন। একশতবার কানে ধরে উঠবস করলাম। বয়সে ছোট এবং শহুরে হওয়ায় শাস্তির ধকল সইতে পারলাম না। অসুস্থ হয়ে পড়লাম। খবর পেয়ে হুজুর আমাকে দেখতে আসলেন। পাশে বসে ভালো—মন্দ জিজ্ঞাসা করলেন। এক ছাত্রকে দিয়ে ওষুধ আনালেন। আরেকজনকে দিয়ে থেকে নিজের বাসা থেকে বোয়াল মাছের তরকারি আর ফলমূল আনালেন। হুজুরের অভূতপূর্ব এই স্নেহ দেখে আমি পুলকিত হই। শ্রদ্ধায় বুকটা ভরে ওঠে। অসুস্থতার কথা ভুলে যাই। এরপর সুস্থ হওয়ার পর দীর্ঘদিন হুজুরের বাসায় খেয়েছি। যেন আমি তার আত্মীয় বা ঘরের লোক। লজ্জা করে একদিন খেতে না গেলে হুজুর রাগ করতেন।
এমন হাজারো নিঃস্বার্থ স্নেহের ফসল আমি অধম। তার কাছে পড়েছি একযুগ গত হলো। আহা, আজ তিনি পৃথিবীতে নেই। তবু আমার তাকে মনে পড়ে। আজও তিনি হাজারো অনুগ্রহ পুঁজি করে আমার অস্তিত্ব জুড়ে মিলেমিশে একাকার হয়ে আছেন।
৩.
এরপর ঢাকায় পড়ব বলে সেখান থেকে চলে আসি। অজপাড়া গাঁয়ে পড়া ছাত্র আমি তখন অনেক কিছুই বুঝি না। ঢাকার পরিবেশটাও মানিয়ে নিতে পারছিলাম না। বড় মাদরাসা, বড় পরিবেশ আর নতুন জীবন। তাই জীবনতরিটা যেন মাঝিহীন মাঝ নদীতে ভাসমান। তখন সবেমাত্র হিফজখানা থেকে বের হয়েছি। খাঁচায় বন্দি মনটা এই কদিনে যেন মুক্ত বাতাসের স্বাদ পেয়েছে, শুধু ঢাকার রাস্তায় ছুটে চলতে চায়। ঘুরাঘুরি, আড্ডা আর রেস্টুরেন্টে ঘুরেফিরেই দিন কেটে যায়। অথচ বিরাট বিরাট স্বপ্ন দিয়ে জীবনটাকে গড়ব ভেবেছিলাম। কখনো সখনো রাতের আঁধারে একাকী হলে বিবেকের হালখাতা খুলে যেত, নিজেকে মনে হতো আমি যেন পথহারা পথিক, পথের দিশা যার নেই। আমার চারিদিক ছেয়ে গিয়েছিল নিরাশার নিকষ কালো আঁধারে। তখন যিনি সকল হতাশা আর নিরাশার আঁধার চিড়ে আলোর বিকিরণ ঘটিয়ে আমার জীবনে আত্মপ্রকাশ করলেন, তিনি মানব গড়ার এক শ্রেষ্ঠ কারিগর। মাওলানা কামরুল হাসান সাহেব হুজুর।
একাধারে যিনি ছিলেন পড়ার পর টেবিলে একজন গুরুগম্ভীর আদর্শ শিক্ষক। চরিত্র সংশোধনের বেলায় যিনি ছিলেন একজন স্নেহশীল পিতা। আদর সোহাগের বেলায় যিনি ছিলেন মমতাময়ী মা। খোশগল্প কিংবা বন্ধুসুলভ আচরণে যিনি ছিলেন উত্তম সঙ্গী। আর শেষ রাতের জায়নামাজে যিনি ছিলেন খোদার রাহে আত্নোৎসর্গকারী একজন মর্দে মুমিন। দিনদিন পাতলা, লম্বা শরীরের গৌরবর্ণ মানুষটা আমার হৃদয়—মন আকৃষ্ট করে নেয়। আমার অজান্তেই স্বপ্ন জয়ের অসীম যাত্রায় তিনি একজন দক্ষ নাবিক হিসেবে ধরা দেন। আজকের এই আমি তার আদর্শেরই প্রতিচ্ছবি যেন! তার ব্যাপারে যতই লিখি, ততই যেন কম হয়। আমার জীবনে তার অবদান অপরিসীম। আমার অস্তিত্বের প্রতিটি কণা তার কাছে ঋণী। আসলেই তার ঋণ অপরিশোধ্য।
মাঝে মাঝে তাদের সান্নিধ্য হারিয়ে খুব আফসোস হয়। শিক্ষাজীবনের বাঁকে বাঁকে যেসব আলোকপ্রদীপ পেয়েছি, হায়, যদি তাদের সান্নিধ্যটা আরেকটু দীর্ঘায়িত হতো! যদি তাদের রঙে আরেকটু রঙিন হতাম! তাহলে জীবনটা আরও উজ্জ্বল, আলোকময় হতে পারত। আহা! তারা ছিলেন আদর্শের বাতিঘর। আমাদের রাহবার।
সবশেষে বলব আল্লাহ যেন তাদের আদর্শকে বুকে লালন করে আমাকে ঘিরে তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করার তাওফিক দান করেন। আর আমাদের উপর জীবিতদের ছায়া দীর্ঘায়িত করেন।
শিক্ষার্থী, জামি’আতুল আবরার রাহমানিয়া মাদ্রাসা, বসিলা, মুহাম্মাদপুর, ঢাকা