হঠাৎ দৃষ্টি পড়ল পথের পাশে দণ্ডায়মান এক প্রবীণ ব্যক্তির উপর। যার মুখ ভরা দাড়ি বুক ছুঁয়ে গেছে। শুভ্র দাঁড়িগুলো যেন বাতাসের সাথে খেলা করছে। মাথায় রয়েছে পাগড়ি ও গায়ে জুব্বা। হাতে একটা লাঠি ও চোখে কালো ফ্রেমের চশমা। মনে হয় বয়সটা ষাট থেকে সত্তরের মাঝামাঝি। শেষ বিকেলের হলদে আভায় তার চেহারার দীপ্তিটা কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। আমরা তাকে দেখে যেন থমকে দাঁড়াই। বিস্মিত দৃষ্টিতে দুজনেই দুজনের দিকে তাকালাম
ছোটবেলা থেকেই আমরা দুজন একই সাথে গ্রামের ছোট্ট মাদরাসায় পড়াশোনা করেছি। কিন্তু গত কয়েক বছর আগে সাফওয়ানের বাবার চাকরির স্থান পরিবর্তন হওয়ায় সাফওয়ানকে হারিয়ে ফেলি। এখন সে পরিবারের সাথে ঢাকায় থাকে। সেখানেই পড়ালেখা ক
আমরা দুজন যদিও বা অপারগতার কারণে একত্র হয়ে মনের ভাব আদান প্রদান করতে পারি না। কিন্তু আমাদের দুজনের মন যেন এক সুতোয় বাঁধা। যেন সর্বদাই সে আমার চিন্তা ও আমি তার চিন্তার মাঝে উপস্থিত থাকি।
এভাবে মাদরাসায় পড়ালেখার মধ্য দিয়ে চলছিল আমাদের দিনগুলো। সুযোগ পেলেই ফোনে কথা হতো আমাদের। এভাবে চলতে চলতে যখন লম্বা এক ছুটি আমাদের সামনে হাজির হয়, তখন পরস্পর একমত হয়ে আমরা আল্লাহর রাস্তায় বের হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করলাম। কেননা এ সফরে দ্বীনি কাজ আঞ্জামের পাশাপাশি দুই বন্ধু বেশ দীর্ঘ সময় একসঙ্গে কাটানো সম্ভব হবে। এরই ধারাবাহিকতায় আমি ও সাফওয়ান পরীক্ষা শেষে তাবলিগে যাওয়ার জন্য বেরিয়ে যাই।
রোজকার মতো শেষ বিকেলে আমরা ঘুরতে বের হই। আজ নতুন এক পথ ধরে হাঁটছিলাম হঠাৎ সেই বৃদ্ধ লোকটিকে দেখে থমকে দাঁড়ালাম।
পথের পাশের সেই বৃদ্ধটির মায়াভরা চেহারায় অপলক নেত্রে তাকিয়ে রইলাম। কেমন জানি মায়াবী ভাব অনুভব করলাম। মনে হলো যেন তিনি আমাদের কোনো আপন মানুষ। চেহারাটা চেনা চেনা লাগলেও কিছুতেই মনে করতে পারছিলাম না।
সাফওয়ান বলল, বন্ধু! তাকে আমার কেমন জানি চেনা চেনা লাগছে। আমারও তা—ই মনে হয়। একটু চিন্তা করো তো তিনি আমাদের আপন কেউ হতে পারে?
দুজনেই লোকটির দিকে এগোলাম আর স্মৃতির পাতা হাতড়াতে লাগলাম। পরক্ষণেই আমার স্মরণে এলো এটা তো আমাদের শ্রদ্ধেয় ওস্তাদ হজরত মাওলানা রুহুল আমিন হাফিজাহুল্লাহ।
তার কাছেই আমাদেও শৈশবের একাংশ কেটেছে। তিনিই ছিলেন আমাদের শিক্ষাজীবনের মুলভিত্তি; তাঁর হাত ধরেই আমাদের পথচলা ইলমের এই শহরে।
আমি ও সাফওয়ান যখন আমাদের গ্রামের ছোট্ট মাদরাসায় পড়াশোনা করতাম, তখন তিনি সেখানকার মক্তব বিভাগের ওস্তাদ ছিলেন। তিনি তাকওয়া, পরহেজগারি, দ্বীনদারি ও চরিত্রগত দিক থেকে অতুলনীয় ছিলেন।
আমরা মাদরাসা থেকে বিদায় নেওয়ার কয়েক মাস পর তিনিও চাকরি ছেড়ে দিয়ে গ্রামের বাড়িতে চলে যান। শুরুর দিকে ফোনে কথা হলেও পরে নম্বর হারানোর কারণে আর কথা হয়নি। যেহেতু সেই সময় আমরা অনেক ছোট ছিলাম, তাই তিনি আমাদেরকে একটু বেশিই আদর করতেন, এজন্য তাঁর কথা মাঝে মাঝেই আমাদের মনে পড়ত।
যদিও অনেকবার আমরা শুনেছিলাম যে, হুজুরের বাড়ি এই অঞ্চলেই। কিন্তু আমাদের জানা ছিল না যে, আমরা যে গ্রামে তাবলিগের দাওয়াত নিয়ে এসেছি, তার পাশের গ্রামটাই হুজুরের গ্রাম।
বাড়ি থেকে এতদূরে এসে আচমকা একজন পূর্বপরিচিত ওস্তাদের সাথে দেখা হওয়ার অনুভূতিটা যে কেমন, তা বলে বোঝানো সম্ভব না।
হুজুর যখন আমাদের দেখলেন, তখন তিনিও আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেলেন। আর আমাদের মনে হচ্ছিল যেন আমরা আমাদের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন জয় করেছি। অতঃপর হুজুর আমাদের বুকে জড়িয়ে ধরলেন, আলিঙ্গন করলেন, যেটা ছিল আমাদের জন্য স্বপ্ন স্বরূপ।
আল্লাহ তায়ালা যেন পৃথিবীর প্রত্যেক ওস্তাদকেই নেক হায়াত দান করেন এবং সকল ওস্তাদ ও ছাত্রের সম্পর্ককে চিরঅটুট রাখেন। আমিন।
শিক্ষার্থী, আল—জামিয়াতুল আরাবিয়া শামছুল উলুম নিশিন্দারা (কারবালা মাদরাসা) বগুড়া