‘তোমায় ধরিতে চাহি, ধরিতে পারিনে।’

স্মৃতিটুকু বেঁচে থাক, এজীবনের ধরাতলে। সেদিনটার কথা আজও মনে পড়ে। কিছু কিছু স্মৃতি আছে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আরও বেশি করে আঁকড়ে ধরে। কিন্তু সেগুলোকে নতুন করে ধরে রাখতে চাইলেও ধরতে পারা যায় না। সবই স্মৃতি হিসাবে তুলে রাখা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। রবি ঠাকুরের ভাষায় বলতে ইচ্ছে করে, ‘তোমায় ধরিতে চাহি, ধরিতে পারি নে।’

শঙ্করী প্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
পড়তে লাগবে 5 মিনিট

আজ এ রকমই একজন ব্যক্তির কথা বলব, যাকে শত চেষ্টা করেও ভোলার নয়। তিনি হলেন আমার শ্রদ্ধেও প্রধান শিক্ষক তারাপদ সরদার মহাশয়। তার স্কুলজীবনের শেষ দিনে চোখের জল যেন বাঁধ মানছিল না। মনের অজান্তেই দুচোখ বেয়ে হু হু করে অশ্রম্ননদীর জলধারার মতো অনবরত গড়িয়ে পড়ছিল। তার বিদায়বেলায় আমরা ছাত্র—ছাত্রী, শিক্ষকসহ সকলে সমবেত হয়েছিলা

সেই গৈরিক বসনধারি শান্ত, সৌম্য, ধীর—স্থির, ন¤্রভদ্র মানুষটি আমাদের ছেড়ে আজ চলে যাবেন, যা আমাদের কল্পনার অতীত।
তিনি ছিলেন আমাদের স্কুলের প্রধান শিক্ষক মহাশয়। এমনিতে শান্ত—শিষ্ট, নম্র—ভদ্র হলেও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন সাংঘাতিক। সেখানে কারোর সাথে কোনো কম্পে্রামাইজ করতেন না। সত্তরের দশকে দাঁড়িয়ে তিনি সেই সময় পঞ্চম শ্রেণি থেকে সপ্তম শ্রেণি অবধি মাতৃভাষার পাশাপাশি ইংরেজি গ্রামার ও স্পোকেন ইংলিশের প্রতি জোর দিয়েছিলেন। বিপ্লবীদের জীবনী নিয়ে দ্রুত পঠন ও শ্রম্নতিলিখনের মতো বিষয়গুলোকে সিলেবাসের অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। সে সময়ে না বুঝলেও আজ অনুধাবন করতে পারি, সেগুলো আমাদের কতটা প্রয়োজনে লেগেছে। লেখাপড়ার পাশাপাশি খেলাধুলার প্রতিও তার সুতীক্ষè নজর ছিল। তাই বোধ হয় বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় মেমোরি টেস্ট বা স্মৃতিশক্তি পরীক্ষার মতো বিষয় নির্বাচন করেছিলেন। শারীরিক কসরতের জন্য এনসিসির ব্যবস্থা করেছিলেন। তা ছাড়া অল্প বয়স থেকে যাতে স্টুডেন্টদের বিজ্ঞানের প্রতি প্রবণতা বাড়ে, তার জন্য ক্লাস সেভেন থেকেই ল্যাবে নিয়ে গিয়ে পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করেছিলেন। এতটাই তিনি দুরদর্শি ছিলেন। তিনি নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছিলেন আগামী দিন বিজ্ঞানের। বর্তমান যুগে তার দুরদর্শিতার পরিচয় অনুধাবন করছি হাড়ে হাড়ে।

বসিরহাটের মাইল সাতেক দূরে অবস্থিত মফস্বলে এই কাটিয়াহাট বিকেএপি ইনস্টিটিউশান আজও স্বগড়িমায় দাঁড়িয়ে। মেধাবী সব স্টুডেন্ট বেরিয়েছে এই বিদ্যালয় থেকে। তার নিজ হাতে সন্তানসম স্কুল ছিল স্বপ্নের মতো। তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী ও মার্জিত মনের মানুষ। সদা স্মিত হাস্যমুখে গার্জেন ও কলিগদের সাথে কথা বলতেন। গৈরিক বসন ও তিলকধারি টুকটুকে ফরসা এই আপনভোলা মানুষটি ছিলেন সকলের আদর্শ ও পথপ্রদর্শক। সেই শতকে বছরে অন্তত দুবার গার্জেন মিটিংয়ের ব্যবস্থা করেছিলেন। তার নির্দেশে ক্লাসের প্রত্যেক ঘরে বিপ্লবী ও মহাপুরুষদের ছবি টাঙানোর ব্যবস্থা হয়। যদিও এই ছবিগুলো প্রত্যেক ক্লাসের স্টুডেন্টরা নিজেদের থেকে চাঁদা দিয়ে কিনত। প্রতি ক্লাসে মনিটর নির্বাচিত হতো ধ্বনি ভোটের মাধ্যমে। সারাবছর ধরে পঠন—পাঠনের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন ছিল। বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় সবচেয়ে দুটি প্রধান আকর্ষণ ছিল গো—অ্যাজ—ইউ—লাইক ও শিক্ষক—ছাত্রদের মধ্যে ফুটবল টুর্নামেন্ট। ফুটবলে স্যারদের জিতিয়ে দিলে একদিন ছুটি পাওয়ার লোভে প্রথমদিকে তারা বেশ কয়েক গোলে পিছিয়ে থাকলেও বিরতির পরে ওনাদেরকে ইচ্ছাকৃতভাবে জিতিয়ে দেওয়া হতো।

সেই সময়ে অষ্টম টু টুয়েলভ অবধি স্কুল ফুটবল লিগের ব্যবস্থা তিনি করেছিলেন। এর জন্য একজন গেম টিচার ছিলেন। শরীর ও মন ভালো রাখার জন্য সপ্তাহে একদিন করে প্রত্যেক শ্রেণিতে পিটি ক্লাসের ব্যবস্থা ছিল। রবীন্দ্র—নজরুল—সুকান্ত জয়ন্তী, ২৩ ও ২৬শে জানুয়ারি, বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো। আমরা সেসব উপভোগ করতাম। অন্যায় করলে শাস্তি পেতেই হবে। সেখানে কোনো আপস নেই। সে যে—ই হোক না কেন। এই ধরনের মনোভাব নিয়ে চলতেন। সকলের জন্য এক নিয়ম।

আজীবন অবিবাহিত এই স্বামীজি শিক্ষক জীবনের অর্ধকাল কাটিয়েছেন তার দাদা—বউদিদের সাথে। অবসরের পর তিনি চলে গেলেন নবদ্বীপের কোনো মঠে। আমৃত্যু তিনি সেখানেই ছিলেন। স্কুলে পঞ্চম—দশম পর্যন্ত তিনি মৌখিক পরীক্ষার ব্যবস্থা করেছিলেন।

ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তিনি এতটাই ওয়াকিবহাল ছিলেন। ছোটদের সাথে তাদের মতন ব্যবহার করতেন। ১৫ই আগস্টে এনসিসির পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষ সাজানোর প্রতিযোগিতা ও পুরস্কারের ব্যবস্থা করেছিলেন তিনি। পঞ্চম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত কর্মশিক্ষার প্রচলন ছিল। হাতে ধরে বিভিন্ন প্রকার মাটির কাজ শেখানো হতো। বিদ্যালয়ের বার্ষিক পরীক্ষার প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানাধিকারী স্টুডেন্টদের পুরস্কারের ব্যবস্থা ছিল। বিদ্যালয়ের পাঠাগার ব্যবহারের নির্দেশ ছিল। তার আমলে এই বিদ্যালয় উন্নতির সোপানে উঠেছিল। সাব ডিভিশনে এই বিদ্যালয় উল্লেখযোগ্য নজির গড়ত। ২৩শে জানুয়ারিতে প্রভাত ফেরির স্মৃতি আজও মনের মণিকোঠায় গেঁথে আছে।

যতই বয়স বাড়ছে ততই যেন স্কুলজীবনের টুকরো টুকরো স্মৃতিগুলো পেছনের ফেলে আসা দিনগুলোর কথা বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়। মনে হয় আবার যদি সেই সোনালি দিনগুলোয় ফিরে যেতে পারতাম, তো বেশ হতো। মনে হয় ‘স্মৃতি তুমি বেদনার’। আবার কখনো গুনগুন করে গাইতে ইচ্ছে করে, ‘এই পথ যদি না শেষ হয়, তবে কেমন হতো তুমি বল তো?

৮/১, পারুই কাঁচা রোড, বেহালা, কলকাতা—৭০০০৬১

শেয়ার করুন
মন্তব্য নেই

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।