ডিজিটাল শিক্ষক!

একবিংশ শতাব্দীর সূচনা থেকে বিশ্বজুড়ে যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে, তার কেন্দে্র রয়েছে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (Information and Communication Technology - ICT)।

সাদিয়া সুলতানা রিমি
পড়তে লাগবে 7 মিনিট

এই ডিজিটাল বিপ্লবের ঢেউ শিক্ষার চিরাচরিত পদ্ধতি ও কাঠামোর ওপর আছড়ে পড়েছে। যার ফলস্বরূপ ক্লাসরুমের পরিবেশ এবং শিক্ষক—শিক্ষার্থীর মিথস্ক্রিয়া মৌলিকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে।

আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষকের ভূমিকা এখন আর কেবল জ্ঞানের প্রথাগত সঞ্চারকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বরং তিনি এখন হয়ে উঠেছেন একজন সহযোগী, পথপ্রদর্শক এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিখন পরিবেশের পরিচালক। তবে, এই পরিবর্তন শিক্ষকসমাজের সামনে এনেছে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ, যা মোকাবিলা করে শিক্ষাব্যবস্থার গুণগত মান নিশ্চিত করাই হলো বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

ডিজিটাল শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষকের ভূমিকা অনেক। গতানুগতিক শিক্ষাদানের মডেল থেকে বেরিয়ে এসে শিক্ষককে এখন বেশ কয়েকটি নতুন দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। যেমন:
১. জ্ঞান—উৎস থেকে নির্দেশক: ঐতিহ্যগতভাবে শিক্ষক ছিলেন জ্ঞানের প্রধান ও একমাত্র উৎস। ডিজিটাল যুগে ইন্টারনেট ও সার্চ ইঞ্জিনের সহজলভ্যতার কারণে জ্ঞান এখন হাতের মুঠোয়। তাই শিক্ষকের ভূমিকা পরিবর্তিত হয়ে হয়েছে ‘পাশের পথপ্রদর্শক’ হিসেবে। শিক্ষক এখন শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করতে, গবেষণা করতে এবং নিজস্ব অনুসন্ধান প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে উৎসাহিত করেন। তিনি শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের সক্রিয়তা ও সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা বিকাশে জোর দেন।

ইন্টারনেটে তথ্যের প্রাচুর্য রয়েছে। কিন্তু সেই তথ্য কতটা নির্ভরযোগ্য, তা যাচাই করা জরুরি। শিক্ষককে এখন শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ভরযোগ্য এবং মানসম্মত ডিজিটাল শিক্ষণ উপাদান বাছাই করে দিতে হয়। তিনি শিক্ষার্থীদের শেখান কীভাবে তথ্য যাচাই করতে হয় এবং ডিজিটাল বিভ্রান্তি এড়িয়ে চলতে হয়।
২. ব্যক্তিগতকৃত শিখন পরিবেশের নির্মাতা: ডিজিটাল টুলস ব্যবহারের মাধ্যমে শিক্ষক প্রতিটি শিক্ষার্থীর প্রয়োজন, গতি এবং শেখার ধরন অনুযায়ী পাঠদান পদ্ধতিকে সাজাতে পারেন। যা গতানুগতিক ক্লাসরুমে প্রায় অসম্ভব ছিল। লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম এবং বিভিন্ন শিক্ষামূলক অ্যাপ শিক্ষকের হাতে শিক্ষার্থীর অগ্রগতি এবং পারফরম্যান্সের ডেটা তুলে দেয়। এই ডেটা ব্যবহার করে শিক্ষক দুর্বলতা চিহ্নিত করে সেই অনুযায়ী বিশেষ সহায়তা দিতে পারেন। শিক্ষক শিক্ষামূলক সফ্টওয়্যার ব্যবহার করে এমন শিখন অভিজ্ঞতা তৈরি করেন, যা শিক্ষার্থীর বর্তমান জ্ঞান বা দক্ষতার স্তরের সাথে স্বয়ংক্রিয়ভাবে খাপ খাইয়ে নেয়। ফলে পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীরা বাড়তি সহায়তা পায় এবং এগিয়ে থাকা শিক্ষার্থীরা আরও গভীরে শিখতে পারে।

৩. ডিজিটাল কনটেন্ট নির্মাতা ও প্রয়োগকারী: আধুনিক শিক্ষণ—শেখানো প্রক্রিয়াকে কার্যকর করার জন্য শিক্ষককে এখন ডিজিটাল কনটেন্টের স্রষ্টা ও সফল প্রয়োগকারী হতে হয়। শিক্ষককে প্রেজেন্টেশন স্লাইড, শিক্ষামূলক ভিডিও, পডকাস্ট এবং ইন্টারেক্টিভ কুইজ তৈরির মতো দক্ষতা অর্জন করতে হয়। ভিডিও ক্লাস ও ভার্চুয়াল ল্যাবের মাধ্যমে তিনি বিমূর্ত ধারণাকে মূর্ত করে তোলেন।

শিক্ষক গুগল ক্লাসরুম, জুম বা অন্যান্য প্ল্যাটফরম ব্যবহার করে দূরবর্তী বা মিশ্রিত শিখন পরিবেশ পরিচালনা করেন। অনলাইন আলোচনা, ব্রেকআউট রুম এবং ডিজিটাল হোয়াইটবোর্ডের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা তাঁর দায়িত্ব।

৪. ডিজিটাল নাগরিকত্বের শিক্ষাগুরু: শিক্ষার পাশাপাশি একজন শিক্ষককে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ডিজিটাল নৈতিকতা ও নিরাপত্তার বোধ জাগ্রত করতে হয়। শিক্ষক শিক্ষার্থীদের ইন্টারনেটের ঝুঁকি (সাইবার বুলিং, ফিশিং, হ্যাকিং) সম্পর্কে সচেতন করেন এবং অনলাইন পরিবেশে দায়িত্বশীল আচরণ করতে শেখান। একবিংশ শতাব্দীর গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা হলো যোগাযোগ, সহযোগিতা, সৃজনশীলতা এবং সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা বিকাশে প্রযুক্তিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে শিক্ষক উৎসাহিত করেন।

শিক্ষকের ভূমিকা যতটাই গুরুত্বপূর্ণ, চ্যালেঞ্জগুলো ঠিক ততটাই কঠিন। এই চ্যালেঞ্জগুলো তিন ভাগে বিভক্ত করা যেতে পারে: প্রযুক্তিগত, কাঠামোগত এবং মনস্তাত্ত্বিক।
১. প্রযুক্তিগত ও সক্ষমতা বিষয়ক চ্যালেঞ্জ: ডিজিটাল ডিভাইস ও সফটওয়্যার পরিচালনায় বহু শিক্ষকের, বিশেষত অপেক্ষাকৃত প্রবীণ শিক্ষকদের পর্যাপ্ত দক্ষতার অভাব রয়েছে। নিয়মিত ব্যবহার ও আপডেটের সুযোগ না পাওয়ায় তাঁরা পিছিয়ে পড়েন। প্রযুক্তির দ্রুত বিবর্তনশীল গতি শিক্ষককে একটি নিরন্তর শেখার প্রক্রিয়ার মধ্যে ঠেলে দেয়। নতুন প্ল্যাটফরম, সফটওয়্যার ও শিক্ষণ কৌশল সম্পর্কে সবসময় ওয়াকিবহাল থাকা অত্যন্ত কঠিন। উচ্চ মানসম্মত, সৃজনশীল ও ত্রুটিমুক্ত ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি করা একটি সময়সাপেক্ষ ও দক্ষতা—নির্ভর কাজ। সব শিক্ষকের পক্ষে পর্যাপ্ত রিসোর্স ও সময় নিয়ে এটি করা সম্ভব হয় না।

২. কাঠামোগত ও লজিস্টিক চ্যালেঞ্জ: প্রত্যন্ত বা গ্রামীণ অঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে মানসম্মত কম্পিউটার ল্যাব, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, উচ্চ গতির ও নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট সংযোগের চরম ঘাটতি রয়েছে। ডিজিটাল বিভাজন সবচেয়ে বড় সামাজিক—শিক্ষাগত চ্যালেঞ্জ। সমাজের প্রান্তিক পর্যায়ের অনেক শিক্ষার্থীর কাছে ডিজিটাল ডিভাইস (স্মার্টফোন, ল্যাপটপ) বা ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ নেই। ফলে ডিজিটাল শিক্ষণ পদ্ধতি চালু হলে শিক্ষার ক্ষেত্রে অসমতা ও বৈষম্য আরও গভীর হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দেওয়া প্রযুক্তিসামগ্রীর (কম্পিউটার, প্রজেক্টর) নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও ত্রুটি সারানোর জন্য প্রশিক্ষিত কারিগরি কর্মীর অভাব একটি নিত্যদিনের সমস্যা। অযত্ন ও অবহেলায় অনেক মূল্যবান সরঞ্জাম নষ্ট হয়ে যায়।

৩. মনস্তাত্ত্বিক ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ: অনেক শিক্ষকের মধ্যে নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ করার ক্ষেত্রে একধরনের মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরোধ বা দ্বিধা কাজ করে। তাঁরা গতানুগতিক পদ্ধতির স্বাচ্ছন্দ্য থেকে বের হতে চান না। পাঠদান, প্রশাসনিক দায়িত্ব, নতুন সিলেবাসের প্রস্তুত এসবের পাশাপাশি ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি ও অনলাইন প্ল্যাটফরম পরিচালনা করা শিক্ষকের ওপর মানসিক চাপ বাড়িয়ে দেয় এবং ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনের ভারসাম্য নষ্ট করে। দূরশিক্ষণ বা অনলাইন পরীক্ষার সময় শিক্ষার্থীদের সততা বজায় রাখা একটি জটিল চ্যালেঞ্জ। নকল প্রতিরোধ ও মূল্যায়নের যথার্থতা নিশ্চিত করতে শিক্ষককে নতুন পদ্ধতি ও প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হয়।

এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করে ডিজিটাল যুগে সফল হওয়ার জন্য শিক্ষক, সরকার এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সকলেরই সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

শিক্ষকদের জন্য নিরবচ্ছিন্ন ও বাস্তবমুখী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। এই প্রশিক্ষণ কেবল প্রযুক্তির ব্যবহার শেখানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা ডিজিটাল শিক্ষণ—শেখানো কৌশল, ডেটা বিশ্লেষণ এবং অনলাইন নিরাপত্তা সম্পর্কে ধারণা দেবে। ‘শিক্ষক বাতায়ন’ বা ‘মুক্তপাঠ’—এর মতো প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে শিক্ষকদের স্ব—প্রশিক্ষণে উৎসাহিত করতে হবে।

সরকারকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে উচ্চ গতির ইন্টারনেট এবং আধুনিক ডিজিটাল সরঞ্জাম সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের জন্য স্বল্পমূল্যের ডিভাইস এবং ডেটা প্যাকেজের ব্যবস্থা করে ডিজিটাল বিভাজন কমাতে হবে। সেই সাথে প্রযুক্তি সরঞ্জামের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য টেকনিশিয়ান ও প্রশিক্ষিত জনবলের ব্যবস্থা করা জরুরি।
ডিজিটাল শিক্ষণ পদ্ধতি গ্রহণের জন্য শিক্ষকদের মানসিক প্রস্তুতি তৈরিতে সহায়তা করতে হবে। নতুন পদ্ধতি ব্যবহারে উৎসাহিত করার পাশাপাশি তাঁদের কাজের চাপ কমানোর জন্য প্রশাসনিক সহযোগিতা দিতে হবে। শিক্ষকদের ডিজিটাল উদ্ভাবনের জন্য পুরস্কৃত করার মাধ্যমে তাঁদের মধ্যে নতুন কিছু করার আগ্রহ সৃষ্টি করা যায়।
ডিজিটাল যুগ শিক্ষাব্যবস্থায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে, যেখানে শিক্ষকের ভূমিকা কেবল তথ্য সরবরাহকারীর নয়, বরং তিনি একজন উদ্ভাবক, সংযোগ স্থাপনকারী এবং অনুপ্রেরণাদাতা।

প্রযুক্তির শক্তিকে কাজে লাগিয়ে শিখন প্রক্রিয়াকে আরও আকর্ষণীয়, কার্যকর এবং ব্যক্তিগতকৃত করার অপার সুযোগ তৈরি হয়েছে। যদিও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, কাঠামোগত দুর্বলতা এবং ডিজিটাল বৈষম্যের মতো বড় চ্যালেঞ্জগুলো এখনও বিদ্যমান, তবে শিক্ষক, সরকার ও সমাজের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই বাধাগুলো অতিক্রম করা সম্ভব।

আজকের শিক্ষককে তাঁর চিরাচরিত গণ্ডি পেরিয়ে একজন ‘নেটওয়ার্ক শিক্ষক’ হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলতে হবে, যিনি বিশ্বায়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করতে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করবেন এবং একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবেন।

শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

শেয়ার করুন
মন্তব্য নেই

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।