নারী শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামে নারী—পুরুষ উভয়ের জন্যই শিক্ষা অর্জন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। মহান রব্বুল আলামীন দ্বীন শিক্ষাকে প্রত্যেক নরনারীর উপর ফরজ করে দিয়েছেন। মানুষ সৃষ্টির সেরা, শরিয়তের ভাষায় আশরাফুল মাখলুকাত যার উপাধি অর্থাৎ সর্বশ্রেষ্ঠ মাখলুকের খেতাবে ভূষিত এ মানব সম্প্রদায়।
যাদের উপর মহান আল্লাহ তায়ালা তাঁর বন্দেগি আবশ্যক করেছেন। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর আমি জিন ও মানবজাতিকে কেবল আমার ইবাদাতের জন্যই সৃষ্টি করেছি।’ (সুরা যারিয়াত: ৫৬)
এই বন্দেগি পালনে মহান রবের পক্ষ থেকে নারী—পুরুষ নির্বিশেষে সকলেই আদিষ্ট। আর আমরা জানি, ইবাদত পূর্ণভাবে আদায়ের জন্য ইলমে দ্বীনের শিক্ষা অপরিহার্য। (যেটুকু না শিখলে ফরজ ইবাদত পালন করা সম্ভব নয়) যেহেতু ইবাদাতের ব্যাপারে নারী—পুরুষ উভয়ে আদিষ্ট, সেহেতু বিদ্যার্জনের জন্য এ দুয়ের রয়েছে সমান অংশগ্রহণের শরিয়ত সম্মত সুযোগ।
অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি পুরুষ বা নারী যে কেউ ভালো কাজ করবে এবং সে ঈমানদার হবে, আমি তাকে অবশ্যই তার ভালো কাজের পুরস্কার দেবো। (সুরা নিসা, ৪:১২৪)
এতে স্পষ্টভাবে নারী শিক্ষার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে।
হাদিসে পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাই যে, রাসুলুল্লাহ সা. সর্বপ্রথম নারীদেরকে শিক্ষার প্রতি উৎসাহিত করেছেন এবং এই শিক্ষার বিধান সর্বপ্রথম বাস্তবায়ন করার সুবর্ণ সুযোগ পেয়েছেন রাসুলুল্লাহ সা.—এর প্রিয় সহধর্মিণী হজরত খাদীজাতুল কুবরা রা.। সাহাবায়ে কেরামের নিকট থেকে নারীরা শিক্ষাগ্রহণ করতেন, এমনকি বড় বড় সাহাবিগণও নারীদের নিকট থেকে শিক্ষাগ্রহণ করতেন।
নারীকে শিক্ষা প্রদানকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ধর্মীয় দায়িত্বপালনে নারীর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। নারী যদি ধর্মীয় শিক্ষা লাভ করে, তাহলে সে ইসলামি বিধান ও ধর্মীয় দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারবে। যেমন, নামাজ, রোজা, হজ ও জাকাতের নিয়মকানুন শিখতে এবং অন্যদের শিক্ষা দিতে পারবে।
নারীর পারিবারিক জীবনে সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়ার জন্য ধর্মীয় শিক্ষা জ্ঞান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন শিক্ষিত নারী তার পরিবারের সদস্যদের সঠিকভাবে গাইড করতে পারে। এটি সন্তানের সঠিক বেড়ে ওঠা এবং সামাজিক জীবনে একটি শক্তিশালী ভিত্তি স্থাপন করে।
সমাজের উন্নয়নে নারীর ভূমিকা অতুলনীয়। সমাজ বা দেশ গঠনে নারী—পুরুষ উভয়ের সমান দায়িত্ব রয়েছে।এ দায়িত্ব সুচারুরূপে সম্পন্ন করতে হলে পুরুষের পাশাপাশি নারীকেও কর্মমুখী শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে হবে, যা তাদের জীবন ও কার্যপ্রণালির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। কবি নজরুল তার নারী কবিতায় বলেন, ‘বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চিরকল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর। কবিতার পঙ্ক্তিতে পরিষ্কার বোঝা যায় মানবকল্যাণে নারীর ভূমিকা কতটা জরুরি ও তাৎপর্যবহ। সবার জন্য পাঠ অনুশীলন অর্থাৎ শিক্ষা অর্জন একান্ত প্রয়োজন।
কোনো জাতিকে বিদ্বান হতে হলে সে জাতির নারীদেরও বিদ্বান হতে হবে। কারণ নারীদের বাদ দিয়ে একটি জাতি কখনো পূর্ণ হতে পারে না। যদি নারীরা শিক্ষিত হন, তাহলে তারা সমাজে সক্রিয়ভাবে অবদান রাখতে পারবে। এটি সামাজিক উন্নয়ন এবং সমতার পথ উন্মুক্ত করে। ইসলাম নারী—পুরুষের মধ্যে কোনো পার্থক্য না করে উভয়কে সমভাবে জ্ঞানার্জনের আদেশ দিয়েছে। কুরআন সকল পাঠককে আদেশ করছে পড়তে, চিন্তা—গবেষণা করতে। অনুধাবন করতে, এমনকি বিশ্ব প্রকৃতির মাঝে লুক্কায়িত বিভিন্ন নিদর্শন থেকে শিক্ষাগ্রহণ করতে। নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে প্রথম যে ওহি নাজিল তার প্রথম শব্দ ছিল ‘ইকরা’ অর্থাৎ পাঠ করো। এখানে স্ত্রী—পুরুষ সকলকেই পাঠ করতে বলা হয়েছে। সুতরাং জ্ঞানার্জন শুধু পুরুষের জন্য সীমাবদ্ধ করা হয়নি, পুরুষের মতো নারীকেও জ্ঞানার্জনের পূর্ণ অধিকার দেওয়া হয়েছে। নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রত্যেক মুসলিম নরনারীর জন্য জীবনব্যাপী জ্ঞানের সাধনা করার নির্দেশ দিয়েছেন। তাই আমাদের উচিত সর্বদা জ্ঞানার্জনে রত থাকা। এমনকি তিনি ক্রীতদাসীদেরকেও শিক্ষার সুযোগ দেওয়ার নির্দেশ দান করেছেন। নারী—পুরুষ নির্বিশেষে সকলেই নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বক্তৃতার আসরে যোগ দিতেন।
বদর যুদ্ধে বন্দিদের শর্ত দেওয়া হয়েছিল যে, তাদের মধ্যে যে কেউ দশজন মুসলিমকে বিদ্যা শিক্ষা দেবে, তাদের প্রত্যেককেই বিনা মুক্তিপণে ছেড়ে দেওয়া হবে।
ইসলামে পার্থিব শিক্ষা লাভ করার জন্য নারীকে শুধু অনুমতিই দেওয়া হয়নি; বরং পুরুষের শিক্ষাদীক্ষা যেমন প্রয়োজন মনে করা হয়েছে, নারীদের শিক্ষা—দীক্ষাও তদ্রƒপ মনে করা হয়েছে। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা এবং অন্যান্য উচ্চ শিক্ষিতা মহিলারা শুধু নারীদের নয়, পুরুষদেরও শিক্ষয়িত্রী ছিলেন। সাহাবি, তাবেয়ি এবং প্রসিদ্ধ পণ্ডিত তাঁদের নিকট হাদিস, তাফসির ও ফিকহ শাস্ত্র অধ্যয়ন করতেন।
ইসলামে নারীর শিক্ষা অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। নারীকে যদি শিক্ষা দেওয়া হয়, তাহলে তারা তাদের মৌলিক মানবাধিকার এবং সমান সুযোগ পাবে, যা তাদের স্বাধীনতা ও আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করে।
অতএব, শিক্ষা ক্ষেত্রে ইসলাম নারী—পুরুষের মধ্যে কোনো পার্থক্য করেনি। উভয়ের অধিকার সমান।
সর্বোপরি বলা যায়, নারী শিক্ষার বিষয়টাকে খাটো করে দেখার কোনো সুযোগ কোথাও নেই। কেননা নারীশিক্ষাকে অবহেলা করে দারিদ্র্য বিমোচন ও সামাজিক প্রগতির কথা চিন্তাই করা যায় না।
কবির উক্তিতে জোর গলায় বলতে হয়—কোন কালে একা হয়নিক জয়ী পুরুষের তরবারি
প্রেরণা দিয়াছে, শক্তি দিয়াছে বিজয় লক্ষী নারী।
সাতক্ষীরা সদর, সাতক্ষীরা