নারীর উন্নয়ন না অধিকারহরণ

প্রথমে আমাদের বুঝতে হবে, নারী—উন্নয়ন বলতে এখানে কী বোঝানো উদ্দেশ্য? আমরা কথায় বলি কিংবা লিখি, কৃষি—উন্নয়ন, শিল্প—উন্নয়ন, নগর—উন্নয়ন ইত্যাদি, এখানে উন্নয়ন দ্বারা উদ্দেশ্য কৃষি খাতে চাষাবাদের উন্নতি ঘটা, শিল্প খাতে যেকোনো শিল্পের উন্নয়ন এবং তাতে বাণিজ্যিক পথ সুগম হওয়া, নগর—উন্নয়ন বলতে নাগরিকদের চলাচল ও যাতায়াতের রাস্তাঘাটসহ শহরকে পরিবেশবান্ধব করে গড়ে তোলা।

সুলাইমান সিরাজ
পড়তে লাগবে 3 মিনিট

কিন্তু নারীবাদীরা নারীর উন্নয়ন বলতে কী বোঝাতে চায়? তারা যদি বোঝাতে চায় ইসলাম নারীকে তার ন্যায্য অধিকার প্রদান করেনি, তাহলে তাদের এই দাবি একেবারেই অবান্তর এবং ভিত্তিহীন। কারণ এ কথা দিবালোকের মতো সুস্পষ্ট এবং অনস্বীকার্য যে, পৃথিবীতে প্রচলিত যত ধর্ম আছে সেগুলোর মধ্যে ইসলামই একমাত্র ধর্ম যা সর্বক্ষেত্রে নারীর পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে এবং বৈধ প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীকে তার প্রাপ্য মর্যাদা প্রদান করেছে। এটা অন্য কোনো ধর্ম কিংবা মতবাদ দিতে সক্ষম হয়নি বরং ইসলাম নারীকে ‘গৃহিণী, সহধর্মিনী’ ইত্যাদি নামে অভিহিত করে পুরুষতান্ত্রিক বহু দায়িত্ব থেকে মুক্ত রেখেছে। পক্ষান্তরে নারী—উন্নয়ন বলতে নারীবাদীরা যদি বোঝাতে চায় পশ্চিমা সভ্যতা—সংস্কৃতির আমদানি করন, সর্বক্ষেত্রে পুরুষের অধীনতা থেকে নারীকে মুক্তকরণ এবং পুরুষ—সমাজে যত্রতত্র অবাধে চালচলন, তাহলে আমাদের খতিয়ে দেখতে হবে, এতে কি সত্যিই নারীর উন্নয়ন হয় না—কি তার মর্যাদা হরণ করা হয়!

ইসলামি আইন মোতাবেক যে কেউ সামর্থ্যবান হলে সম্পত্তির মালিক হতে পারে। এক্ষেত্রে নারী—পুরুষ, মুসলিম—অমুসলিম, বালেগ—নাবালেগ কোনো ভেদাভেদ নেই। এমনকি ইসলাম নারীদের সকল ধরনের ব্যয়ভারের দায়িত্ব পুরুষের সবল কাঁধে চাপিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্তে জীবনযাপনের ব্যবস্থা করে দিয়েছে। পার্থক্যটা এভাবে বুঝুন, ইসলাম নারীকে মিরাসের অংশ এবং মোহরানা প্রধানের নির্দেশ দিয়েছে। পক্ষান্তরে ইসলাম ব্যতীত অন্য কোনো ধর্মে পৈতৃক সম্পত্তিতে নারীর প্রাপ্য অধিকার সুরক্ষিত নয়। পশ্চিমা ভোগবাদী চিন্তাচেতনা নারীকে ভোগের সামগ্রীতে পরিণত করতে চায়। বিপরীতে ইসলাম নারীকে মাতৃত্বের সুমহান মর্যাদা দিয়ে সম্মানের সর্বোচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত করতে চায়। পশ্চিমা নারীবাদী চিন্তাধারা নারীকে পরপুরুষের সাথে অবাধ মেলামেশা করতে শেখায়। বিপরীতে ইসলাম নারীকে জেনা—ব্যাভিচারের ধারেকাছে যেতেও কঠোরভাবে নিষেধ করে। পশ্চিমা ভোগবাদী দর্শন নারীকে মাতৃত্বের মর্যাদা থেকে বঞ্চিত করে। বিপরীতে ইসলাম নারীকে মাতৃত্ব গ্রহণে উৎসাহিত করে। পশ্চিমা মুক্তচিন্তা নারীকে পুরুষের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কর্মক্ষেত্রে যেতে নির্দেশ করে। বিপরীতে ইসলাম পরিবার পরিচালনার গুরুদায়িত্ব পুরুষের কাঁধে সোপর্দ করে নারীর কায়িক শ্রমকে হালকা করে দিয়েছে।

মোটকথা ইসলামি আইন—অনুশাসন মেনে জীবনযাপনে না তো পুরুষের পশ্চাৎপদতা আর না নারীর পশ্চাৎপদতা। বরং ইসলামের ইতিহাসে এমন অজস্র ঘটনা আছে যেখানে একজন নারী পূর্ণাঙ্গভাবে ইসলামি অনুশাসন মেনে জীবনযাপন করেও বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। এখানে জেনে রাখা দরকার যে, মহান আল্লাহ তায়ালা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন এক বিশেষ উদ্দেশ্যে। তা হলো আল্লাহ তায়ালার ইবাদত করা। সুতরাং একজন মুসলিম হিসেবে শুধু দুনিয়ার কোনো ক্ষেত্র কিংবা অঙ্গনে বিরাট কোনো ভূমিকা রাখতে পারাই মূল উদ্দেশ্য নয়। কিন্তু পশ্চিমা দর্শন মতে, পুরুষের মতো নারীও খেলাধুলায়, ব্যবসা—বাণিজ্যে, চাকরি—বাকরিসহ পুরুষদের সকল কর্ম ক্ষেত্রে সমভাবে অংশগ্রহণ করাই জীবনের মূল লক্ষ্য। যাতে নারীর যথাযথ সম্মান ও মর্যাদা এবং নারীর মাতৃত্ব—মর্যাদা ও নিরাপত্তা চরমভাবে লঙ্ঘিত হয়। সুতরাং নারী—উন্নয়নের নামে পশ্চিমাদের যে মুখরোচক স্লোগানে আজ দুনিয়ার নারীরা অধঃপতনের দিকে ক্রমাগত অগ্রসরমান। এতে নারীদের উন্নয়ন নয় বরং নারী—উন্নয়নের নামে নারীকে অধঃপতন এবং নারীর অধিকার হরণের এক জঘন্য পরিকল্পনা!

শিক্ষানবিশ: জামিয়া ইসলামিয়া আরাবিয়া, তাঁতীবাজার ঢাকা—১১০০

শেয়ার করুন
মন্তব্য নেই

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।