নারী শব্দটি উচ্চারণেই এক কোমলতা, কিন্তু বাস্তবতার পরতে—পরতে সে যেন রক্তাক্ত এক প্রশ্ন। অধিকার ও মর্যাদার প্রশ্নে আজও নারীর পথ যেন কণ্টকাকীর্ণ। সমাজ তার জন্য সাজিয়ে রেখেছে কিছু ভূমিকা, কিছু পরিচয়, তবে কি সে তার সত্তার পূর্ণতা পায়? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমাদের ফিরে তাকাতে হয় তিনটি স্তম্ভের দিকে—ধর্ম, সমাজ ও আইন। ত্রিভুজের মাঝখানে নারী কোথায় দাঁড়িয়ে আছে? আদৌ কি সে সমতার ছায়া খুঁজে পেয়েছে?
ধর্মীয় প্রেক্ষাপট: ইসলামের আলোয় নারীর সম্মান
ইসলাম নারীকে দিয়েছে এক অভূতপূর্ব সম্মান, যা তার আগেও ছিল না, পরেও কমই দেখা গেছে। ‘জান্নাত মায়ের পায়ের নিচে।’ এই ঘোষণায় নারীকে শুধু শ্রদ্ধা নয়, ঈমানের মর্যাদায় উন্নীত করা হয়েছে। বিবি খাদিজা রা. ছিলেন একজন সফল ব্যবসায়ী ও রাসুলের প্রথম আশ্রয়দাত্রী। আয়েশা রা. ছিলেন উম্মুল মুমিনিন, হাদিসের বিশাল অংশের বর্ণনাকারী।
কুরআনে বলা হয়েছে: ‘তোমাদের মধ্যে যারা সৎকর্ম করে, সে পুরুষ হোক বা নারী, আমি তাদের উত্তম জীবন দান করব।’ (সুরা নাহল: ৯৭)
ইসলাম নারীকে দিয়েছে উপার্জনের অধিকার, মীরাসে অংশ, শিক্ষা অর্জনের সমান সুযোগ এবং পছন্দমাফিক জীবনসঙ্গী নির্বাচনের স্বাধীনতা। কিন্তু সেই ধর্মীয় আলোকে যদি সমাজ অন্ধ হয়ে থাকে, তবে সেই অন্ধত্ব কেবল নারী নয়, পুরো মানবতাকেই আচ্ছন্ন করে।
সামাজিক প্রেক্ষাপট:
রীতিনীতির জালে বন্দি নারী সমাজ নারীকে দিয়েছে আড়াল, দিয়েছে নিয়ম, দিয়েছে নীরবতা। তার কথা বলার আগেই তাকে বলা হয়—‘এটা তোমার কাজ নয়।’ তার স্বপ্ন দেখার আগেই তাকে বলা হয়—‘তোমার সীমা আছে।’ আজও কন্যাসন্তান জন্মের পর অনেক পরিবারে নেমে আসে নীরব অন্ধকার। আজও নারীকে বলা হয়, ‘তোমার দায়িত্ব শুধু সংসার, তুমি স্বপ্ন দেখতে পারো না।’ কিন্তু সেই নারীই তো গড়ে তোলে পরিবার, সমাজ ও জাতি। তবুও সে বঞ্চিত হয় সিদ্ধান্তে অংশগ্রহণ থেকে, অধিকারে—উপেক্ষিত, মর্যাদায়—হেয়প্রতিপন্ন। সমাজের চোখে আজও নারী যেন আত্মনির্ভরতা নয়, পরনির্ভরতার প্রতীক। অথচ, তার হাত ধরেই আগামীর সভ্যতা জন্ম নেয়।
আইনি প্রেক্ষাপট:
অধিকার প্রতিষ্ঠায় আইন, বাস্তবে সীমাবদ্ধতা বাংলাদেশের সংবিধান নারীকে দিয়েছে সমান অধিকার—ধারা ২৮ বলছে, নারী ও পুরুষের মধ্যে রাষ্ট্রীয় সুযোগ—সুবিধায় কোনো বৈষম্য থাকবে না। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০; যৌতুক নিরোধ আইন, ১৯৮০; বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭ —এসব আইন নারীর পক্ষে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু আইনের ভাষা আর বাস্তবতা যেন দুই মেরুতে দাঁড়িয়ে। গ্রামবাংলার নারী আজও ন্যায়বিচারের জন্য পঞ্চায়েত বা প্রভাবশালী মাতব্বরের দ্বারে, ধর্ষণ ও সহিংসতার ঘটনায় বিচার বিলম্বিত হয়, অনেক সময় ন্যায়ের বদলে মীমাংসা হয় চাপিয়ে দেওয়া চুক্তিতে। কর্মজীবী নারীকে অনেক ক্ষেত্রেই হয়রানি, বৈষম্য, নিরাপত্তাহীনতা পিছু ছাড়ে না। আইন আছে, কিন্তু সাহস নেই, প্রয়োগ নেই।
আর এই ফাঁকেই থেমে যায় হাজারো নারীর স্বপ্ন, সম্ভাবনা, অস্তিত্ব।
নারী কোনো করুণা বা দয়ার পাত্রী নয়। সে তার অধিকার চায়, মর্যাদার আসনে বসতে চায়। ধর্ম তাকে দিয়েছে আলো, সমাজ দিতে পারে সম্মান, আইন দিতে পারে নিরাপত্তা—শুধু দরকার আন্তরিক প্রয়োগ, মানবিক চেতনা আর দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। নারীর অধিকারের লড়াই আসলে পুরো সমাজের আত্মিক মুক্তির লড়াই। কারণ যেখানে নারী স্বাধীন, নিরাপদ ও মর্যাদাসম্পন্ন, সেখানেই গড়ে ওঠে একটি প্রকৃত সভ্যতা।
ঢাকা—১২৩০