মানবগঠনের কারিগর

উসমান বিন আবদুল আলিম

পৃথিবীর ইতিহাসে যত মহান মানুষ, যত প্রজ্ঞাবান মনীষী, তাঁদের পেছনে ছিলেন কোনো না কোনো শিক্ষক, যিনি তাঁদের চিন্তায়, চরিত্রে ও নীতিতে রেখেছেন অমোচনীয় ছাপ।

মানুষ জন্মগতভাবে নির্দোষ ও অপূর্ণ। শিক্ষা তাকে করে তোলে সচেতন, পরিপূর্ণ, আর সেই শিক্ষার প্রধান উৎস হচ্ছেন শিক্ষক। শিক্ষকের কাছ থেকেই শেখা যায় কেবল জ্ঞান নয়, শেখা যায় জীবনবোধ নৈতিকতা সত্য ও সৌন্দর্যের উপলব্ধি।
শিক্ষক মানবতার স্থপতি: একজন শিক্ষক সমাজে এমন এক ভূমিকা রাখেন, যা অনেক সময় অদৃশ্য হলেও গভীরভাবে প্রভাবিত করে প্রজন্মকে। তিনি ছাত্রকে বইয়ের অক্ষর শেখান ঠিকই কিন্তু তার চেয়েও বড় শিক্ষা দেন কীভাবে মানুষ হতে হয়। যিনি নিজের আলো দিয়ে অন্যকে আলোকিত করেন, তিনি—ই প্রকৃত শিক্ষক। প্রাচীন যুগে শিক্ষক বা গুরু ছিলেন সমাজের জ্ঞানভান্ডার। তাঁদের কাছে শিষ্যরা শুধু পাঠ্য জ্ঞানই নয় জীবনের অর্থও শিখত। আজও সেই ভাবধারা বর্তমান সময় বদলেছে, মাধ্যম বদলেছে কিন্তু শিক্ষকের গুরুত্ব চিরকালীন।

সময়ের পরিবর্তনে শিক্ষকের ভূমিকা: প্রযুক্তির এই যুগে জ্ঞানের উৎস সীমাহীন কিন্তু সেই জ্ঞানকে সঠিকভাবে ব্যবহারের শিক্ষা দেন শিক্ষকই। ইন্টারনেট আমাদের তথ্য দেয় কিন্তু বিচারবোধ শেখায় না। রোবট প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে, কিন্তু উৎসাহ দিতে পারে না। শিক্ষকই জানেন কখন একটি কিশোরকে অনুপ্রাণিত করতে হয়, কখন কঠোরভাবে পথ দেখাতে হয়, কখন ভালোবাসায় জড়িয়ে ধরতে হয়।
সমাজে শিক্ষকের প্রভাব: শিক্ষক শুধু স্কুলের ভেতরে নয়, সমাজের প্রতিটি স্তরে প্রভাব রাখেন। তাঁর তৈরি ছাত্ররাই হয় ডাক্তার, প্রকৌশলী, সাহিত্যিক, বিজ্ঞানী ও নেতা। তিনি সমাজকে দেন নৈতিক ভিত্তি, সংস্কৃতির ধারা, আর জাতিকে দেন দিকনির্দেশনা।

কিন্তু দুঃখজনকভাবে আজ অনেক জায়গায় শিক্ষকদের প্রাপ্য মর্যাদা দেওয়া হয় না। তাঁদেরকে কেবল চাকরিজীবী মনে করা হয়। অথচ তাঁরা জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণ করেন। তাঁদের অবদান অদৃশ্য হলেও অমূল্য। তাই সমাজের প্রতিটি নাগরিকের উচিত শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা প্রকাশ করা।

ইতিহাসের আলোয় শিক্ষক: বিশ্বের ইতিহাস সাক্ষী শিক্ষকের প্রভাবেই গড়ে উঠেছে মহান ব্যক্তিত্বরা। নবি করিম সা. নিজেই ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক, যিনি অন্ধকারাচ্ছন্ন আরবসমাজে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিয়েছিলেন।
শিক্ষক ও ছাত্রের সম্পর্ক: একজন শিক্ষক আর ছাত্রের সম্পর্ক কেবল জ্ঞানের নয়, তা আত্মিক বন্ধনেরও। একজন ভালো শিক্ষক তাঁর ছাত্রকে শুধু ভালো নম্বর পাওয়ার পথে পরিচালিত করেন না, বরং জীবনের বাস্তবতা বোঝাতে সাহায্য করেন। তিনি ভুলকে দেখান শিক্ষা হিসেবে ব্যর্থতাকে দেখান সম্ভাবনা হিসেবে।

যেখানে এই সম্পর্ক সম্মান ও ভালোবাসার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, সেখানে গড়ে ওঠে এক আলোকিত প্রজন্ম। একজন শিক্ষক জাতির নির্মাতা মানবগঠনের কারিগর। তাঁর হাতেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চিন্তা, মূল্যবোধ ও নৈতিকতার বীজ বপন হয়। তাঁর স্পর্শেই অন্ধকার মন জেগে ওঠে আলোয় তাঁর দিকনির্দেশনাতেই এক শিশু হয়ে ওঠে সচেতন নাগরিক।
তাই আমাদের প্রত্যেকের কর্তব্য, শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা, তাঁদের অবদান স্মরণ রাখা, আর তাঁদের আলোয় নিজেদের পথ আলোকিত করা। কারণ, যে জাতি শিক্ষককে সম্মান করে, সেই জাতিই আলোকিত হয়।

শিক্ষার্থী, সদর, ময়মনসিংহ

শেয়ার করুন
উসমান বিন আবদুল আলিম একজন উদীয়মান ইসলামি চিন্তাবিদ, গবেষক ও লেখক। তরুণ বয়সেই তিনি ইসলামের বিভিন্ন শাখায় জ্ঞানার্জন ও গবেষণায় মনোনিবেশ করেন। কুরআন, হাদীস, ইসলামি দর্শন ও ইতিহাসের ওপর তাঁর গভীর অন্তর্দৃষ্টি এবং চিন্তাশীল লেখনিতে তরুণ প্রজন্মের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। ইসলামি মূল্যবোধ ও আধুনিক চিন্তার সমন্বয় ঘটিয়ে তিনি একটি সময়োপযোগী দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করছেন, যা বর্তমান প্রজন্মকে ইসলামের প্রকৃত সৌন্দর্য বুঝতে সহায়তা করে। পাশাপাশি, তিনি নিয়মিত বিভিন্ন পত্রিকা ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে লেখালেখি করছেন — যেখানে ইসলামের মৌলিক শিক্ষা, আত্মউন্নয়ন এবং সমাজ সংস্কারের বিষয়ে তার বিশ্লেষণ প্রশংসিত হচ্ছে।
মন্তব্য নেই

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।