তাঁর রাজনীতি ছিল ক্ষমতাকেন্দ্রিক নয়, নৈতিকতা কেন্দ্রিক। তিনি বিশ্বাস করতেন-রাষ্ট্র টিকে থাকে শক্তিতে নয়, টিকে থাকে ইনসাফে। তাই তাঁর বক্তব্যে ছিল স্পষ্টতা, অবস্থানে ছিল দৃঢ়তা, আর চিন্তায় ছিল ভবিষ্যতের দায়বদ্ধতা। স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আপস নয়-এটাই ছিল তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের মূল সুর।
শহিদ ওসমান হাদির সবচেয়ে বড়ো পরিচয়-তিনি ভয়ের সংস্কৃতির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন। যে সমাজে সত্য বলার মূল্য জীবন দিয়ে চুকাতে হয়, সেখানে তিনি সত্য বলা থামাননি। তাঁর বিশ্বাস ছিল, ন্যায়বিচার বিলম্বিত হতে পারে, কিন্তু পরাজিত হয় না। অথচ পরিহাস এই-আজও তাঁর হত্যার বিচার হয়নি। এই বিচারহীনতা শুধু একটি পরিবারের বেদনা নয়; এটি একটি রাষ্ট্রের নৈতিক ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি।
বিচারহীনতার দীর্ঘ ছায়া আমাদের সামনে এক কঠিন প্রশ্ন তোলে, আমরা কি শহিদের রক্তের মর্যাদা দিতে পেরেছি? নাকি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমরা স্মৃতিকে নরম করে ফেলেছি? শহিদ ওসমান হাদির প্রসঙ্গ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, বিচার কেবল আদালতের বিষয় নয়, এটি জাতির বিবেকের বিষয়।

তিনি যে ইনসাফভিত্তিক সমাজের স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা কোনো ইউটোপিয়া নয়। এটি এমন এক সমাজ, যেখানে শক্তিশালী নয়Ñসত্য জয়ী হয়; যেখানে রাষ্ট্র নাগরিককে ভয় দেখায় না-নিরাপত্তা দেয়; যেখানে শহিদের রক্ত প্রশ্ন হয়ে ঝুলে থাকে না-বিচারে রূপ নেয়।
আজ শহিদ ওসমান হাদি শুধু একজন ব্যক্তি নন, তিনি একটি নৈতিক মানদণ্ড। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়Ñদেশপ্রেম মানে অন্ধ আবেগ নয়, সচেতন দায়িত্ব। তাঁর শাহাদাত আমাদের মনে করিয়ে দেয়-কলম থেমে গেলে ইতিহাস থেমে যায়।
তাই এই লেখা শুধু স্মরণ নয়, এটি একধরনের অঙ্গীকার-ইনসাফের পক্ষে কথা বলা থামবে না। বিচারের দাবি ম্লান হবে না।
শহিদ ওসমান হাদির কণ্ঠ হয়তো স্তব্ধ করা হয়েছে, কিন্তু তাঁর আদর্শ আজও প্রশ্ন করে-আমরা কোন পক্ষে দাঁড়াব? নীরবতার, না ন্যায়ের?
ইতিহাসের প্রতিটি যুগেই কিছু মানুষ জন্ম নেয়, যারা কেবল নিজের জন্য নয় বরং সমাজ, রাষ্ট্র এবং মানুষের অধিকারের কথা বলে। তারা স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন তোলে, প্রতিবাদ করে এবং পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখে। এই মানুষগুলোকেই আমরা বলি বিপ্লবী। বিপ্লবী মানে ধ্বংস নয়, বিপ্লবী মানে নির্মাণ। বিপ্লব মানে শুধু ক্ষমতা দখলের লড়াই নয়, বিপ্লব মানে অন্যায়কে অন্যায় বলতে শেখা। বিপ্লব মানে ভয়কে ভয় বলতে শেখা, ভয়কে অতিক্রম করে সত্য উচ্চারণ করা। রাজনীতির মাঠে এই বিপ্লব আরও কঠিন, কারণ এখানে সত্য বলার মূল্য অনেক বেশি।
ক্ষমতা, প্রভাব, হুমকি সবকিছুর মাঝেও যে মানুষ ন্যায় ও নীতির কথা বলে, সেই প্রকৃত বিপ্লবী, রাজনৈতিক। একজন বিপ্লবী রাজনৈতিক হওয়া মানে নিখুঁত হওয়া নয় বরং সত্যের পথে থাকার চেষ্টা। বিপ্লবী রাজনীতি অন্যায়কে অন্যায় বলতে শেখায় এবং সমাজকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে আজ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন এমন বিপ্লবী মানুষদের, যারা ক্ষমতার কাছে মাথা নত করবে না, আবার সহিংসতাকেও আদর্শ মনে করবে না। বিপ্লবীরা সুবিধার পথ নয় বরং ঝুঁকির পথ বেছে নেয়। সাম্প্রতিক সময়ে এমন এক বিপ্লবীর নাম ছিল ওসমান হাদি। শরীফ ওসমান হাদি বাংলাদেশের একটি সাধারণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার শিক্ষাজীবন ছিল খুবই চ্যালেঞ্জিং। কিন্তু তিনি কঠোর অধ্যবসায়ের মাধ্যমে সব বাধা অতিক্রম করেছিলেন। ছোটোবেলা থেকেই সমাজের অসংগতি ও অন্যায়ের প্রতি সংবেদনশীল ছিলেন। তার বেড়ে ওঠা এমন এক বাস্তবতায়, যেখানে প্রশ্ন করা সহজ ছিল না, কিন্তু প্রয়োজন ছিল। এই বাস্তবতাই ধীরে ধীরে তার চিন্তার জগৎকে গড়ে তোলে।
ওসমান হাদি তার চিন্তা ও অবস্থানের মাধ্যমে অনেক তরুনের মনে আলোড়ন তুলেছিলেন। ওসমান হাদি নিজেকে কখনো রাজনৈতিক হিসেবে উপস্থাপন করতে চাননি। তিনি ছিলেন প্রতিবাদী কণ্ঠের একজন প্রতিনিধি, যিনি বিশ্বাস করতেন, রাজনীতি মানুষের কল্যাণের জন্য, ক্ষমতা, আরাম কিংবা ভোগের জন্য নয়। তিনি রাজনীতিকে কেবল ক্ষমতার লড়াই হিসেবে দেখতেন না। তার মূল লক্ষ্য ছিল ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা এবং মানুষের কল্যাণ করা। অনেক সময় তিনি এমন কাজ করতেন, যা সাধারণ মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করত না, কিন্তু তা সমাজের মানুষের জন্য ছিল অনেক গুরুত্বপূর্ণ। তার সাহস তরুণ প্রজন্মকে চিন্তাশীল হতে অনুপ্রাণিত করত। তিনি তরুণদের রাজনীতিতে আগ্রহী করতে চেয়েছিলেন। তিনি চাইতেন তরুণরা যেন প্রশ্ন করতে শেখে, বিশ্লেষণ করতে শেখে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে শেখে। তার বিশ্বাস ছিল ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যদি প্রশ্ন না করে, তবে অন্যায় চিরস্থায়ী হয়ে যাবে। তাই তার কথাবার্তা, বক্তব্য, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের উপস্থিতি তরুণদের মাঝে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি রাষ্ট্র তখনই শক্তিশালী হয়, যখন নাগরিক প্রশ্ন করতে পারে।
তার রাজনীতি ছিল সেই প্রশ্ন করার রাজনীতি। রাজনীতির বাইরে তিনি ছিলেন একজন নিবেদিত সাহিত্যিক। প্রবন্ধ, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ এবং কবিতার মাধ্যমে তিনি মানুষের মনে নতুন দিক এবং ভাবনার আলো ছড়িয়েছিলেন। অনেক সময় তার এই সাহিত্যকর্ম প্রকাশিত হয়নি, কিন্তু তার ভাবনা সমাজে গভীর প্রভাব ফেলেছে। আজ ওসমান হাদি নেই, কিন্তু তার কথাগুলো সামাজিক আলোচনায় রয়ে গেছে। তার সাহস অনেক তরুণকে ভাবতে শিখিয়েছে রাজনীতি মানে শুধু একটি দল নয়, রাজনীতি মানে দায়িত্ব। মৃত্যু কখনোই তার শেষ নয়। মৃত্যু থামায় একটি দেহকে, কিন্তু থামাতে পারে না একটি আদর্শকে। ওসমান হাদির ক্ষেত্রেও তা—ই হয়েছে। তিনি আজ শারীরিকভাবে উপস্থিত না থাকলেও তার চিন্তা, তার প্রশ্ন এবং তার সাহস মানুষের মনে রয়ে গেছে। এই আদর্শই তার প্রকৃত উত্তরাধিকার। ওসমান হাদির গল্প কখনো শেষ হয়নি। এটি একটি যাত্রা যা নতুন প্রজন্মকে চিন্তা করতে এবং সঠিক পথ খুঁজে নিতে সাহায্য করে। কারণ বিপ্লবীর মৃত্যু শরীরের, চিন্তার নয়।
শিক্ষার্থী, হিসাববিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা কলেজ।