থার্টিফার্স্ট নাইট: ইতিহাস ও নিরাপত্তা

ডিসেম্বরের শেষ প্রান্তে ঢাকা শহর এক অদ্ভুত উত্তেজনায় সেজে ওঠে। রাস্তাঘাটে ঝলমল আলো, মানুষের চোখে উচ্ছ্বাস, আর আকাশে উড়ছে রঙিন আতশবাজি। তরুণ সমাজের কাছে এই রাতটি পরিচিত “থার্টিফার্স্ট নাইট” হিসেবে। এটি বছরের শেষের বিদায়, বন্ধু-বান্ধব এবং পরিবারের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগির রাত।

তাশরীফ আহমদ
পড়তে লাগবে 5 মিনিট

থার্টিফার্স্ট নাইট উদযাপনের প্রথা মূলত পশ্চিমা দেশগুলো থেকে এসেছে। ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, বছরের শেষ রাতকে আনন্দ, সঙ্গীত এবং আতশবাজির মাধ্যমে উদযাপন করা হয়। প্রাচীনকাল থেকে এই রাতকে নতুন বছরের আগমনকে স্বাগত জানানোর মাধ্যমে উদযাপন করা হয়েছে।
বাংলাদেশে থার্টিফার্স্ট নাইট উদযাপন মূলত শহুরে তরুণ সমাজের মধ্যে জনপ্রিয়। ঢাকার হোটেল, রেস্তোরাঁ, পাবলিক স্পেস এবং বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার বিভিন্ন প্রাঙ্গণ এই রাতের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। এখানে বন্ধুবান্ধব একত্র হয়, পটকা ফোটানো হয়, রকেট ছোড়া হয়, এবং আনন্দের এক ভিন্ন রূপ সৃষ্টি হয়। তবে এই জনপ্রিয়তার সঙ্গে জড়িত বিপদও কম নয়।

ঢাকা শহরে থার্টিফার্স্ট নাইট উদযাপন শুধুই আনন্দের নয়। এটি যেন নতুন বছরের আগমনের প্রতীক। হোটেল, কফি শপ, পাবলিক পার্ক—সব জায়গায় ভিড় থাকে। কিছু পরিবার বাড়ির ছাদে বা খোলা মাঠে আতশবাজি ফোটায়। বন্ধুদের সঙ্গে রাস্তায় হাঁটাহাঁটি করে আনন্দ ভাগাভাগি করা হয়। তবে, ইসলামে এটি নিষিদ্ধ। অনৈতিক উল্লাস, ফায়ারওয়ার্ক দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ উদযাপন, এবং নিরাপত্তা অগ্রাহ্য করা ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে গ্রহণযোগ্য নয়। তবুও, সামাজিক ও আন্তর্জাতিক প্রভাবের কারণে এই প্রথা আমাদের দেশে প্রচলিত হয়ে এসেছে। প্রচলনের কারণে অনেকে এটিকে আনন্দের রাত হিসেবে গ্রহণ করছে, কিন্তু ইসলামের নিয়ম অনুযায়ী সতর্কতা ও নিরাপত্তা মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি।

প্রতিবছর ঢাকা শহরের বিভিন্ন অংশে ৩১ ডিসেম্বর রাতের উদযাপনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ছোট্ট অসাবধানতা, অনুমোদনবিহীন আতশবাজি বা অযাচিত উল্লাস প্রায়ই বড় ক্ষতি ডেকে আনে। কখনও কখনও শুধু সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, মানুষের জীবনও ঝুঁকিতে পড়ে। একটি উদাহরণ দিয়ে বোঝানো যায়। কয়েক বছর আগে রাজধানীর কেন্দ্রস্থলে একটি বড় আতশবাজি প্রতিযোগিতা চলাকালীন একটি ফায়ারওয়ার্ক অসাবধানতাবশত পাশের দোকানের ছাদে লেগে যায়। মুহূর্তের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে পড়ে চারপাশের দোকানগুলোতে। বহু মানুষ আহত হয়, অনেকের সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ছোট্ট অসাবধানতাও বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে। অনুমোদনবিহীন আতশবাজি বা পটকা ফোটানো শহরের আগুন লাগার প্রধান কারণ। বৈদ্যুতিক লাইন, কাঠের ছাদ, বা ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা—এই সবকিছুকে সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা না করলে দুর্ঘটনা সহজেই ঘটতে পারে।
ভিড়ের কারণে অনেক সময় উদযাপন নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে যায়। কেউ যদি অসাবধানতা করে বা নিয়ম না মেনে আতশবাজি ফোটায়, তা মুহূর্তেই বিপদ ডেকে আনে। প্রতি বছরই মানুষ আহত হয়, অনেকের সম্পদ নষ্ট হয়, এবং কখনও কখনও প্রাণহানিও ঘটে।

ইসলামী দৃষ্টিকোণ

ইসলামে জীবন, স্বাস্থ্য এবং সম্পদ রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, “নিজের ক্ষতি বা অন্যের ক্ষতি নিজে না কর”। ইসলামে যে কোনো ঝুঁকিপূর্ণ কাজ, যা নিজের বা অন্যের জীবন, শরীর বা সম্পদকে বিপদে ফেলে, তা গ্রহণযোগ্য নয়। যদিও থার্টিফার্স্ট নাইট সামাজিকভাবে প্রচলিত, ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে এটি নিষিদ্ধ। আনন্দ গ্রহণের নামে ঝুঁকি নেওয়া, অন্যকে বিপদে ফেলা, বা অগ্নিসংক্রান্ত উল্লাস করা ইসলাম অনুমোদন করে না। নবী মুহাম্মাদ (সা.) বলেছেন, “প্রত্যেক কাজে মধ্যপন্থা অনুসরণ করো, অতিরিক্ত কিছু ক্ষতি ডেকে আনতে পারে।” এটি নির্দেশ করে যে আনন্দের সঙ্গে সতর্কতা ও সামাজিক দায়িত্ব পালন অপরিহার্য। ইসলাম শিক্ষা দেয় যে আনন্দ গ্রহণের সময় অন্যের জীবন ও সম্পদ রক্ষা করতে হবে।

নিরাপদ উদযাপনের অর্থ হলো পরিকল্পিত আনন্দ, যা নিজেকে বা অন্যকে বিপদে ফেলে না। সরকারি নির্দেশিত নিরাপদ ফায়ারওয়ার্ক ব্যবহার করা, নির্দিষ্ট ও খোলা মাঠে আতশবাজি ফোটানো, নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা—সবই কেবল সামাজিক সচেতনতা নয়, ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে দায়িত্বও।

শিশু, কিশোর এবং তরুণদের জন্য থার্টিফার্স্ট নাইট একটি শিক্ষণীয় উদাহরণ হতে পারে। ছোটবেলায় আমরা আগুনের বিপদের কথা শিখি, বড় হয়ে প্রায়শই তা ভুলে যাই। সতর্কতার সঙ্গে উদযাপন করা শুধু নিজেদের জন্য নয়, প্রিয়জন, বন্ধু এবং পুরো সমাজকে বিপদ থেকে রক্ষা করে।
সরকারি ও সামাজিক উদ্যোগও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস এবং স্বেচ্ছাসেবী দল রাতভর প্রস্তুত থাকে। তারা জানে এক মুহূর্তের অসাবধানতা কত বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে। আমাদের উচিত তাদের নির্দেশনা মেনে চলা এবং পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনা করে উদযাপন করা।

সামাজিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব

থার্টিফার্স্ট নাইট কেবল আনন্দের রাত নয়, এটি সামাজিক বন্ধন ও পরিবারিক সম্পর্কের দৃঢ়তাও গড়ে তোলে। বন্ধুবান্ধব একত্র হয়, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটায়, আর পুরোনো বছরের স্মৃতিগুলোকে বিদায় জানায়। তবে আনন্দ গ্রহণের সঙ্গে সতর্কতা না মানলে, এই সামাজিক সম্পর্কের ক্ষতি হতে পারে। শিশু, কিশোর এবং তরুণদের জন্য এটি একটি শিক্ষণীয় সময়। তারা শেখে কিভাবে আনন্দের সঙ্গে সতর্কতা বজায় রাখা যায়। যদিও প্রথাটি ইসলামে অনুমোদিত নয়, তবুও সামাজিক বাস্তবতার কারণে এটি প্রচলিত। এজন্য সঠিক দিকনির্দেশনা, নিরাপদ ব্যবস্থাপনা এবং সতর্কতার মাধ্যমে উদযাপন নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।

শেয়ার করুন
মন্তব্য নেই

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।