সুরা আন—নিসায় বলা হয়েছে, ‘পুরুষরা নারীদের উপর দায়িত্বশীল, কারণ আল্লাহ একজনকে অন্যজনের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন এবং তারা তাদের সম্পদ থেকে ব্যয় করে।’ এই আয়াতে পুরুষের দায়িত্বশীলতার পাশাপাশি নারীর মর্যাদা ও নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। কুরআন ও হাদিসে নারীর অধিকার, দায়িত্ব ও মর্যাদা সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত। সুরা আল বাকারার ২২৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘নারীদের তেমনি ন্যায়সংগত অধিকার রয়েছে, যেমনি রয়েছে নারীদের উপর পুরুষদের।’ সুরা আন—নাহলের ৯৭ নম্বর আয়াতে ঘোষণা করা হয়েছে, ‘ঈমানদার অবস্থায় যে কেউ সৎকর্ম করবে, সে পুরুষ হোক বা নারী, তাকে আমি পবিত্র জীবন দান করব এবং পরকালে উত্তম বিনিময় দান করব।’ এতে নারী—পুরুষের মধ্যে কোনো পার্থক্য করা হয়নি, মানবিক অধিকার ও মর্যাদার প্রশ্নে সবাই সমান।
ইসলাম নারীকে সম্পত্তি, শিক্ষা, স্বাধীন ইচ্ছা ও সম্মানিত জীবনযাপনের অধিকার দিয়েছে। নারী তার সম্পত্তির উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে, যা পশ্চিমা সমাজে ১৯শ শতাব্দীর আগে অকল্পনীয় ছিল। হজরত খাদিজা রা. একজন সফল ব্যবসায়ী ছিলেন, যিনি নিজের সম্পদ পরিচালনা করতেন। বিবাহে মোহরানা নারীর আর্থিক নিরাপত্তার প্রতীক এবং স্বামীর উপর স্ত্রীর ভরণপোষণের দায়িত্ব অর্পিত। সুরা নিসার ৩২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘পুরুষরা যা উপার্জন করে তা তাদের প্রাপ্য অংশ, আর নারীরা যা উপার্জন করে তা তাদের প্রাপ্য অংশ।’ নারীর অর্জিত অর্থে কেউ হস্তক্ষেপ করতে পারে না। রাসুলুল্লাহ সা. বলেছেন, ‘আল্লাহ প্রয়োজনে ঘরের বাইরে যাওয়ার জন্য নারীদের অনুমতি দিয়েছেন।’ তৎকালে মুসলিম নারীরা ব্যবসা—বাণিজ্য, কৃষিকাজ ও কারুকর্মে অংশ নিতেন। ইসলামের আগমন জাহেলি অন্ধকারের বিরুদ্ধে নারী মুক্তির বিপ্লবী পথ দেখিয়েছে। কুরআন কন্যাসন্তান হত্যা নিষিদ্ধ করেছে। সুরা আত—তাকভিরে বলা হয়েছে, ‘যখন জীবন্ত প্রোথিত কন্যাকে জিজ্ঞাসা করা হবে, কী অপরাধে তাকে হত্যা করা হলো?’ রাসুল সা. বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি দুটি কন্যাসন্তানকে যথাযথভাবে লালনপালন করবে, সে জান্নাতে আমার সঙ্গী হবে।’ হাদিসে আরও বলা হয়েছে, ‘যার তিনটি কন্যা বা বোন থাকবে, সে তাদের প্রতি যত্নশীল হলে এবং আল্লাহকে ভয় করে, তার জন্য বেহেশত অনিবার্য।’
নারীকে বিবাহে পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। রাসুল সা. বলেছেন, ‘প্রাপ্তবয়স্কা নারীকে তার সম্মতি ব্যতীত বিবাহ দেওয়া যাবে না।’ হজরত ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, এক নারীর পিতা তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিবাহ দিলে রাসুল সা. বিচ্ছেদ ঘটিয়ে তার পছন্দের ব্যক্তির সঙ্গে বিবাহের নির্দেশ দেন। তালাকপ্রাপ্তা বা বিধবা নারীদের পুনর্বিবাহের স্বাধীনতা রয়েছে। রাসুল সা. বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই উত্তম, যে তার স্ত্রীর নিকট উত্তম।’ ইসলামে শিক্ষা নারী—পুরুষ উভয়ের জন্য ফরজ। কুরআনের সুরা আলাকের প্রথম আয়াত জ্ঞানার্জনের নির্দেশ দিয়ে শুরু হয়। সুরা জুমারে বলা হয়েছে, ‘যারা জানে আর যারা জানে না, তারা কি সমান?’ হাদিসে বলা হয়েছে, ‘জ্ঞানার্জন প্রত্যেক মুসলমান নরনারীর জন্য ফরজ।’ হজরত আয়েশা রা. হাদিস ও ফিকহের শিক্ষক হিসেবে বিখ্যাত ছিলেন। পরকালীন কল্যাণে নারী—পুরুষ সমান। সুরা নিসার ১২৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘যে সৎকাজ করবে, পুরুষ বা নারী, ঈমানদার হলে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে, তার ওপর বিন্দুমাত্র অবিচার হবে না।’ নারীর অপবাদ থেকে সুরক্ষার জন্য কঠোর বিধান রয়েছে। সুরা নুরে বলা হয়েছে, ‘যারা সতীসাধ্বী নারীর উপর ব্যভিচারের অপবাদ আরোপ করে এবং চারজন সাক্ষী আনতে না পারে, তাদের ৮০টি বেত্রাঘাত করবে।’
জাহেলি যুগে নারীদের অধিকার ছিল না, কন্যাসন্তানকে জীবন্ত কবর দেওয়া হতো। হিন্দু ধর্মে সতীদাহ প্রথায় বিধবাদের চিতায় পোড়ানো হতো, মনুসংহিতায় নারীদের স্বাধীনতা অস্বীকার করা হয়। ইউরোপে ১৫শ থেকে ১৮শ শতাব্দীতে ‘ডাইনি—শিকারে’ লাখ লাখ নারীকে হত্যা করা হয়। ইতিহাসবিদ ব্রেইন লেভাকের মতে, এই নিপীড়ন প্রায়শই পারিবারিক বিবাদের কারণে ঘটত। পাদরিরা পানিতে ডুবিয়ে পরীক্ষা করতেন: বেঁচে ফিরলে ‘ডাইনি’ বলে পোড়ানো হতো, মরলে নির্দোষ ধরা হতো। ম্যালিয়াস ম্যালেফিকারাম গ্রন্থে নারীদের পাপী ও দুর্বল হিসেবে চিত্রিত করা হয়, যা এই নিপীড়নকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়। এই নিপীড়নের বিপরীতে ইসলাম নারীদের জন্য ন্যায়ভিত্তিক পথ দেখিয়েছে। পশ্চিমা ফেমিনিজম নারীকে পুরুষের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামিয়ে তার শরীর ও সৌন্দর্যকে বাণিজ্যিকীকরণ করেছে। ইসলাম নারীকে এই অবক্ষয় থেকে রক্ষা করে পরিবার ও সমাজের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
বাংলাদেশে নারী অধিকারের নামে গড়ে ওঠা আন্দোলনগুলো প্রায়শই পশ্চিমা মতাদর্শের অন্ধ অনুকরণে লিপ্ত। এগুলো পর্দা ও ইসলামি পোশাকের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালায়, নারীকে বস্তুগত দৃষ্টিকোণে উপস্থাপন করে। এই আন্দোলনগুলো নারীর দায়িত্ব, পরিবারের প্রতি ভূমিকা ও নৈতিক অবদানকে উপেক্ষা করে, ফলে নারীকে বস্তুগত অস্তিত্বে পরিণত করে। রাস্তায় বিক্ষোভ বা অশ্লীলতা নারীকে সম্মানের পরিবর্তে অবমাননার দিকে নিয়ে যায়। ইসলাম নারীকে পর্দার মাধ্যমে তার সৌন্দর্য ও শালীনতা রক্ষার নির্দেশ দিয়েছে। সুরা আন—নুরের ৩১ নম্বর আয়াতে পর্দা ও শালীনতার কথা বলা হয়েছে। নারী পরিবারের কেন্দ্রবিন্দু, সন্তান লালনপালন, স্বামীর সঙ্গী হওয়া ও সমাজে নৈতিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। হাদিসে বলা হয়েছে, ‘জান্নাত মায়ের পায়ের নিচে।’ ইসলামে নারীর অধিকার তার দায়িত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
নারী যদি ধন্য হতে চায়, তবে ইসলামের শিক্ষার কাছে আত্মসমর্পণই একমাত্র পথ। পশ্চিমা ফেমিনিজমের নামে প্রচারিত উলঙ্গপনা ও বিশৃঙ্খলা নারীকে তার প্রকৃত মর্যাদা থেকে দূরে সরায়। ইসলাম নারীকে শিক্ষা, সম্পত্তি ও স্বাধীন ইচ্ছার অধিকার দিয়েছে, যা তার পরিবার ও সমাজের প্রতি দায়িত্বের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ। ইসলাম নারীকে পণ্য নয়, সমাজের অমূল্য ধন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। নারীর প্রকৃত মর্যাদা ও হিস্যা প্রতিষ্ঠার জন্য ইসলামই একমাত্র পথ। প্রখ্যাত অমুসলিম মনীষী পিয়েরে ক্রাবাইট বলেছেন, ‘মুহাম্মদ সা. নারীঅধিকার প্রদানের ক্ষেত্রে সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব, যা পৃথিবীতে আর কখনো দেখা যায়নি।’ ইসলামের ছায়াতলে নারী তার সম্মান, নিরাপত্তা ও আধ্যাত্মিক শান্তি অর্জন করতে পারে।
প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট।
নারী মুক্তির আন্দোলনে ইসলাম