পাশ্চাত্যের কালো থাবা

বর্তমানে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিধর রাষ্ট্র হচ্ছে আমেরিকা। তারাই আজ বিশ্বব্যবস্থার নিয়ন্ত্রক এবং তারা সর্বদা এই ক্ষমতা ধরে রাখতে চায়—যাতে ভবিষ্যতে এই ‘সুপার পাওয়ার’ অন্য কারও হাতে না চলে যায়। এ লক্ষ্যেই পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী গ্রহণ করেছে বহু সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা। তারা চায়, মানুষের ঘাড়ে গোলামের শৃঙ্খল চাপিয়ে দিতে।

মুহাম্মাদ আলাউদ্দিন
পড়তে লাগবে 6 মিনিট

কিন্তু ইসলাম এমন এক ধর্ম, যা সমস্ত শৃঙ্খল ভেঙে মানুষকে প্রকৃত স্বাধীনতার পথ দেখায়। এই ধর্ম মানুষকে শেখায় তার প্রতিপালক ছাড়া কারও কাছে মাথা নত না করতে। আর এ কারণেই, আজকের বিশ্ব মোড়লরা ইসলামকে দেখছে এক ‘প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি’ হিসেবে। তাদের বুদ্ধিজীবীরা চায়, পাশ্চাত্য সভ্যতাকে ইসলামের মুখোমুখি দাঁড় করাতে, যাতে মানুষ বিভ্রান্ত হয়, স্বাধীনতাকে ভুলভাবে চিনে ফেলে।

ইসলাম এমন এক জীবনব্যবস্থা, যা পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র—সবক্ষেত্রে মিশে থাকে স্বাভাবিক নিয়মে। ইসলামে ব্যক্তিগত আচরণ থেকে শুরু করে সামাজিক দায়বদ্ধতা পর্যন্ত সবকিছুতেই ভারসাম্য ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়েছে। অন্যদিকে পাশ্চাত্য সমাজে পরিবারব্যবস্থা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়েছে। সন্তান, পিতা—মাতা কিংবা স্বামী—স্ত্রীর মধ্যে সম্পর্ক হয়ে উঠছে শিথিল ও আত্মকেন্দি্রক। ইসলাম নারীকে দিয়েছে মর্যাদা, সম্মান ও নিরাপত্তা। মায়ের আসন দিয়েছে জান্নাতের চাবিকাঠি হিসেবে। পক্ষান্তরে পাশ্চাত্যের চোখে নারী অনেকসময়ই হয়ে ওঠে এক ভোগ্যপণ্য; তাদের স্বাধীনতার নামে নামিয়ে আনা হয় বিপণনের হাতিয়ারে। ইসলাম চায় নারীর সম্মান রক্ষা হোক, আর পাশ্চাত্য নারীকে ব্যবহারের বস্তু করে তোলে—এটাই হলো দুই দর্শনের মৌলিক পার্থক্য।

ইসলামে নারীর মর্যাদা ও সম্মান অপরিসীম। কুরআন ও হাদিস নারীকে দিয়েছে উচ্চ আসন—মা হিসেবে তার পায়ের নিচে জান্নাত, স্ত্রী হিসেবে তার প্রতি সদ্ব্যবহার করা ঈমানের নিদর্শন, কন্যা হিসেবে সে হয়ে ওঠে জাহান্নাম থেকে রক্ষার মাধ্যম। অন্য অনেক ধর্ম ও সভ্যতায় নারীরা এ মর্যাদা পায়নি; কখনো তারা দেবদেবীর ক্রোধ নিবারণের উপায়, কখনো শুধুই ভোগের বস্তু হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

কিছু নারীবাদী গোষ্ঠী ইসলামের নারীর প্রতি এই সম্মান ও সুরক্ষাকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে। ইসলাম যখন নারীর নিরাপত্তার জন্য তাকে ঘরে রাখাকে গুরুত্ব দেয়, তারা একে ‘বন্দিত্ব’ বলে প্রচার করে। ইসলাম যখন নারীর ভরণপোষণের দায়িত্ব পুরুষের উপর রাখে, তারা একে বলে ‘অসহায়ত্ব’। অথচ বাস্তবে এটি নারীর সম্মান রক্ষারই এক বাস্তব ও দায়িত্বশীল পদ্ধতি।

এই দৃষ্টিভঙ্গি ভ্রান্তির পেছনে রয়েছে ইসলামকে বিকৃতভাবে তুলে ধরার এক দীর্ঘ প্রচেষ্টা, যার লক্ষ্য ইসলামি সমাজব্যবস্থাকে দুর্বল করা। অথচ আল্লাহ বলেন, “وَقَرْنَ فِي بُيُوتِكُنَّ”— “আর তোমরা নিজেদের ঘরে অবস্থান করো…” (সুরা আহযাব, আয়াত ৩৩), এটি কোনো নিপীড়ন নয়, বরং নিরাপত্তা ও মর্যাদার নির্দেশনা। ইসলাম নারীকে বোঝা নয়, বরং রত্ন হিসেবে বিবেচনা করে। যার রক্ষা, যত্ন ও মর্যাদা আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত।

ইসলামের ইতিহাসে নারী সাহাবিদের বীরত্বগাথা এক উজ্জ্বল অধ্যায়। সবচেয়ে প্রাচীন নার্স হিসেবে বিবেচিত হন রুফায়দা আল—আসলামিয়া রহ., যিনি আহত সাহাবিদের সেবা করতেন। ওহুদ যুদ্ধে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন আহত হন, তখন একজন নারী সাহাবি নুসাইবা বিনতে কাব রা. তলোয়ার হাতে তাঁকে রক্ষায় বুক পেতে দেন।
একজন ব্যক্তি নবি করিম সা.—কে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আমার ওপর কার অধিক হক রয়েছে?’ তিনি উত্তর দিলেন, ‘তোমার মা।’ আবার জিজ্ঞাসা করলে বললেন, ‘তোমার মা।’ তৃতীয়বারেও বললেন, ‘তোমার মা।’ চতুর্থবার বললেন, ‘তোমার বাবা।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৯৭১)
এই হাদিস প্রমাণ করে, নারীর—বিশেষত মায়ের—অধিকার ও মর্যাদা ইসলামে কতটা বিশাল। ইসলামের আলোকে নারী শুধু ঘরে নয়, সমাজেও সম্মানিত ও কার্যকর ভূমিকা পালন করেছেন।

ইসলামের বিধান অনুসারে, একজন নারী বিবাহের পূর্ব পর্যন্ত তার পিতার জিম্মায় থাকবেন, এবং তার সমস্ত ব্যয়ভার পিতা বহন করবেন। বিবাহের পর এই দায়িত্ব স্বামীর ওপর বর্তায়। আর বয়সের শেষ প্রান্তে, বৃদ্ধকালে মা হোন বা দাদি, তাদের রক্ষণাবেক্ষণ সন্তানের দায়িত্ব।

আল্লাহ তাআলা কুরআনে পিতা—মাতার প্রতি সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন: ‘তোমার প্রতিপালক আদেশ করেছেন যে, তোমরা তাঁকে ছাড়া কারও ইবাদত করবে না এবং পিতা—মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবে। তাদের একজন বা উভয়ে যদি বার্ধক্যে উপনীত হন, তবে তাদের ‘উফ্‌’ বলো না এবং ধমক দিয়ো না…।’ (সুরা ইসরা, ১৭:২৩)

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: ‘তোমরা নারীদের কষ্ট দিয়ো না। তারা তো তোমাদের নিকট আমানত। তোমরা যেমন আহার কর, তাদেরকেও তা খাওয়াও। তোমরা যেমন পরিধান করো, তাদের জন্যেও তেমনই ব্যবস্থা করো।’ (তিরমিজি: ১১৬৩)
এই হলো ইসলামের নারীনীতির সংক্ষিপ্ত প্রতিফলন, যেখানে নারীকে দায়িত্বহীন নয়, বরং সম্মান ও সুরক্ষার ছায়ায় রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

ইসলাম নারীদের যথাযথ সম্মান ও মর্যাদা প্রদান করেছে। পারিবারিক বন্ধনের মাধ্যমে তাদেরকে মমতা, ভালোবাসা ও সুরক্ষার পরশ দিয়েছে। অথচ পাশ্চাত্য সভ্যতা নারীর এই মমতাময় অবস্থান ভেঙে দিয়ে তাকে রাস্তায় নামিয়ে আনতে চায়। নারী জাতির স্বাভাবিক ও খোদা প্রদত্ত ‘লজ্জা ও আবরুর গুণ নষ্ট করার জন্য সমাজে কিছু তথাকথিত নারীবাদীকে তুলে ধরা হয়েছে।

তাদের দাবি—‘আমার শরীর, আমার সিদ্ধান্ত’, ‘আমার পেটে যার খুশি, তার সন্তান’, কিংবা ‘আমার দেহ আমি যতটুকু ইচ্ছা ঢেকে রাখব, আর যতটুকু ইচ্ছা প্রকাশ করব’—এসব কথা শুধু বাহ্যিক স্বাধীনতার নামে আত্মিক দাসত্বেরই আরেক রূপ। প্রতিটি সৃষ্টিরই নিজস্ব স্বভাব, গঠন ও দায়িত্ব রয়েছে। নারী ও পুরুষের ভিন্নতাকে অস্বীকার করে যদি উভয়ের অধিকার ও ভূমিকা এক করে ফেলা হয়, তবে তা সমাজে ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি করবে। এ অবস্থায় নারী হয়ে উঠবে ভোগের পণ্য, হারিয়ে ফেলবে নিজের সম্মান, আর বিশ্বকে ঠেলে দেবে নতুন এক জাহিলিয়াতের দিকে।

ইসলাম নারীর মর্যাদা ফিরিয়ে দিয়েছে—যেখানে সে দাসী নয়, বরং মা, মেয়ে, স্ত্রী ও একটি সমাজের সম্মানের প্রতীক। এই শিক্ষাই মানবতার প্রকৃত মুক্তির পথ।

শেয়ার করুন
মন্তব্য নেই

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।