শিক্ষা, জ্ঞানার্জন হচ্ছে প্রতিটি জাতির উন্নয়নের মাপকাঠি। বিদ্যালাভের মাধ্যমে মানুষের পরিচয় ঘটে বিশ্বজগতের জানা—অজানা নানা তথ্যের সাথে। শিক্ষার সাথে তিনটি বিষয় ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকে।
শিক্ষাদান , শিক্ষাগ্রহণ ও শিক্ষা পদ্ধতি। শিক্ষাদানের প্রধান কান্ডারি অধ্যাপক, শিক্ষক। শিক্ষাদান ও শিক্ষাগ্রহণের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থান করে শিক্ষাপদ্ধতি। শিক্ষকগণ মানসম্মত ও রুচিসম্মত শিক্ষাপদ্ধতির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেয়। শিক্ষার্থীরা শিক্ষকগণদের দেখানো পথে রুচিসম্মত শিক্ষা গ্রহণ করে। মানুষের জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় হচ্ছে ছাত্রজীবন। আর ছাত্রজীবনে পথপ্রদর্শক হিসেবে অভিভাবকদের পরেই শিক্ষকদের অবস্থান।
আমার ছাত্রজীবনের স্কুল পর্যায়ে আদর্শ গুণসম্পন্ন শিক্ষকগণের সান্নিধ্য খুব একটা হয়নি। তবে কলেজজীবনের স্নাতক পর্যায়ে একজন শিক্ষকের সান্নিধ্য লাভ করার সুযোগ পাই। সে শিক্ষকের নাম মো. আলী ইদ্রিস।
একজন শিক্ষকের মধ্যে যেসব সৎ, আদর্শ ও রুচিসম্মত গুণাবলিসম্পন্ন চরিত্র থাকা অত্যাবশ্যকীয়, ইদ্রিস স্যারের মধ্যেও সেই সকল সৎ ,আদর্শ ও রুচিসম্মত গুণের পরিচয় পাওয়া যায়। মজার বিষয় হলো, অনার্স ২য় বর্ষ অধ্যয়নকালে তিনি আমাদের কলেজে বহিঃপরীক্ষক হিসেবে এসেছিলেন। আর এর পরের বছরই ইদ্রিস স্যার আমাদের কলেজে বিভাগীয় প্রধান (বাংলা) হিসেবে যোগদান করেন। সপ্তাহের তিন দিন তিনি আমাদের ক্লাস নিতেন। তিনি কলেজে যোগদানের অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই বাংলা বিভাগ তো বটেই আর সব শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে একধরনের আত্মিক আকর্ষণ গড়ে ওঠে ইদ্রিস স্যারের সাথে।
তাঁর সাথে শিক্ষার্থীদেরও সুন্দর মেলবন্ধন গড়ে ওঠে। কোনো শিক্ষার্থী যখন কোনো সমস্যা বা অসুবিধার সম্মুখীন হয়, তখন পরামর্শের জন্য ইদ্রিস স্যারের কাছে ছুটে যায়। ব্যক্তিগতভাবে তিনি আমাকে অনেক স্নেহাদ্রর্ দৃষ্টিতে দেখতেন। অন্যান্য শিক্ষার্থীদের মতো তিনি আমাকে অনেক বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছেন, উপদেশ দিয়েছেন। ইদ্রিস স্যারের মধ্যে আরও সৃজনধর্মী গুণ আছে, যা অন্যদের মতো আমাকেও বিশেষভাবে আকর্ষণ করে। যেমন কোনো উৎসব, অনুষ্ঠান, রবীন্দ্র—নজরুল জয়ন্তী সংক্রান্ত কোনো অনুষ্ঠান করতে হলে তিনি নিজের উদ্যোগে স্বল্প সময়ে অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ফেলতেন। স্যারের উপস্থিতিতে আমাদের কলেজ বিশেষ করে আমাদের বিভাগ সজীব ও প্রাণবন্ত হয়ে উঠত। স্যারের উদ্যোগেই বাংলা বিভাগে দুইবার রবীন্দ্র—নজরুল জয়ন্তী পালিত হয়েছে।
আমাদের কলেজে পহেলা ফাগুন, পহেলা বৈশাখ, একুশে ফেব্রুয়ারি প্রভৃতি জাতীয় দিবস বরাবরই উদ্যাপিত ও পালিত হয়ে থাকে। কিন্তু রবীন্দ্র—নজরুল জয়ন্তী সেভাবে উদ্যাপনের জন্য কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ইদ্রিস স্যারের প্রচেষ্টার কারণেই রবীন্দ্র—নজরুল জয়ন্তী পালন করা গেছে। তা ছাড়া ইদ্রিস স্যারের সফল ব্যবস্থাপনায় বিভাগীয় অন্য শিক্ষকমণ্ডলীর সহায়তায়, শিক্ষার্থীদের উৎসাহ ও অনুপ্রেরণায় বাংলা বিভাগ থেকে হুমায়ূন স্মৃতিতীর্থ নুহাশপল্লীতে শিক্ষা সফরে যাওয়ার সুযোগ হয়।
সেখানে বৃষ্টিবিলাস, লীলাবতী দিঘীসহ চতুর্দিকে সবুজবেষ্টনী উদ্যান নয়নাভিরাম দৃশ্যপট দর্শনে মন প্রফুল্ল হয় এবং নয়ন জুড়িয়ে যায়। তারটর হুমায়ূন আহমেদের সমাধিস্থল দর্শন এবং কবর জিয়ারত করা হয়। তারপর মধ্যাহ্নভোজ এবং মনোজ্ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শেষে হাসি—গান—আনন্দ—বেদনার মধ্য দিয়ে কলেজে প্রত্যাবর্তন করে প্রত্যেকে নিজ নিজ বাড়িতে গমন করে। স্মৃতিবিজড়িত সেই দিনটা অনেক আনন্দময় এবং উপভোগ্য ছিল।
ইদ্রিস স্যারের সংস্পর্শে বাংলা বিভাগসহ সম্পূর্ণ কলেজ যেন নবরূপ লাভ করে, নতুন স্পন্দন খুঁজে পায়। কলেজ ম্যাগাজিন বরাবরই করা হয়। কিন্তু স্বতন্ত্র বিভাগের কোনও ম্যাগাজিন করা হয়নি। ইদ্রিস স্যার স্বতন্ত্র বিভাগের জন্য, (বিশেষ করে বাংলা বিভাগের, যাতে অন্য বিভাগের শিক্ষকমণ্ডলী ম্যাগাজিন করার জন্য স্ব—বিভাগের শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করতে পারেন) ম্যাগাজিন প্রকাশের উদ্যোগ নেন।
৪র্থ বর্ষের শিক্ষার্থী হিসেবে আমাদেরকে ম্যাগাজিন প্রস্তুতের বিষয়ে অত্যধিক মূল্যায়ন করা হয়। ম্যাগাজিন প্রস্তুতের জন্য যাবতীয় তথ্য, বিষয়বস্তু সংগ্রহের জন্য ৪র্থ বর্ষের শিক্ষার্থীদের উপর দায়িত্বভার দেওয়া হয়। প্রায় অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী যাবতীয় তথ্য প্রদান ও বিষয়বস্তু সংযোজনসহ যাবতীয় তথ্যাদি দায়িত্বরত চারজন শিক্ষার্থীদের কাছে জমা দেয়। পরবর্তী সময়ে ইদ্রিস স্যারের তত্ত্বাবধানে যাবতীয় তথ্য সংযোজন—বিয়োজনের মাধ্যমে একটি পূর্ণাঙ্গ ম্যাগাজিন প্রস্তুত করা হয়। মধ্যযুগের প্রথম মহিলা কবি চন্দ্যাবতীর নামানুসারে ম্যাগাজিনের নামকরণ করা হয় চন্দ্রাবতী।
কিন্তু এই আনন্দঘন পরিবেশের মধ্যে একটা বেদনাবার্তা বয়ে আসে। ইদ্রিস স্যারের অন্যত্র কলেজের বদলির নির্দেশনা আসে। স্যারের বিদায়ি অনুষ্ঠানে বিভাগীয় শিক্ষকমণ্ডলীর উপস্থিতিতে ম্যাগাজিন চন্দ্রাবতী’র মোড়ক উন্মোচন করা হয়। ইদ্রিস স্যারসহ অন্য শিক্ষকদের বক্তৃতা প্রদান, মতবিনিময় করতেই ফটোসেশনের মধ্য দিয়ে বিদায়ি অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়।
কলেজজুড়ে শোকাবহ পরিবেশ তৈরি হয়। শিক্ষক—শিক্ষার্থীসহ সকলেই বেদনার্ত হয়ে পড়ে। শোকার্ত—বেদনায় চারপাশের বাতাস যেন ভারী হয়ে ওঠে। ইদ্রিস স্যার আমাদের কলেজে (৮ মাস) স্বল্পকাল অবস্থান করলেও কলেজের অভ্যন্তরীণ উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে সার্বিক ভূমিকা পালন করেন। বিদায়বেলায় তিনি আমাদের উদ্দেশে একটি কথা বলে গিয়েছিলেন। বলেছিলেন, আমরা যেন বিদ্যা—বুদ্ধির চারা রোপণ করে যাই , যে চারা গাছ পরবর্তী প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিদ্যা—বুদ্ধির শাখা প্রসারিত করে বৃক্ষে পরিণত হবে। বর্তমানে তিনি মুক্তাগাছা শহীদ স্মৃতি কলেজে অধ্যক্ষ পদে কর্মরত আছেন। তিনি আমাদের কলেজে নেই, কিন্তু তিনি যে বিদ্যা, বুদ্ধির শেকড় সঞ্চালন করে গেছেন, সেই ধারা আমাদের কলেজে এখনও প্রবাহমান। ইদ্রিস স্যারের অনেক স্মৃতিবিজড়িত কথা মনে উঁকি দেয়, প্রযুক্তির কল্যাণে স্যারের সাথে যোগাযোগও হয় মাঝেমধ্যে। স্যার যেখানেই থাকুক, উনি ভালো থাকুক এই কামনা করি।
আকুয়া জুবিলী কোয়ার্টার, ময়মনসিংহ।