পুরো স্কুলটা যেন আজ অন্যরকম আলোয় ভেসে যাচ্ছে। বিকেলের সোনালি রোদ জানালা দিয়ে এসে পড়েছে করিডরে, দেওয়ালে ঝুলে থাকা নানা ছবি আর পুরস্কারের ফ্রেমগুলোর ওপর সেই রোদের কোমল ছায়া নাচছে। মাঠে ছোটদের খেলার ধ্বনি শোনা যাচ্ছে দূর থেকে, কিন্তু দশম শ্রেণির ক্লাসরুমে আজ এক অন্যরকম পরিবেশÑঅপেক্ষা, আবেগ আর অদ্ভুত নীরবতা।
আজ অনিরুদ্ধ স্যারের শেষ ক্লাস। তিরিশ বছরের শিক্ষাজীবনের অবসান হবে এই ঘণ্টার শেষে। ছাত্র—ছাত্রীদের মুখে হাসি নেই, আছে এক অদ্ভুত গম্ভীরতা।
স্যার ধীরে ধীরে ক্লাসে ঢুকলেন। তাঁর পরিপাটি ধুতি—পাঞ্জাবি, মুখে সেই চেনা মৃদু হাসি। কিন্তু চোখের গভীরে যেন হাজার গল্প। তিনি নিজের টেবিলে ব্যাগ রেখে বললেন, ‘আজ কোনো পাঠ্যবই খুলতে হবে না। আজ আমরা গল্প বলবÑজীবনের গল্প।’
সবাই চুপচাপ তাকিয়ে আছে তাঁর দিকে। স্যার শুরু করলেন নিজের স্কুলজীবনের কথাÑ
‘আমি তোমাদের মতোই একদিন বেঞ্চে বসে থাকতাম। তখন এক শিক্ষক বলেছিলেন, বইয়ের জ্ঞানই সব নয়, মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতাও শিখতে হবে। এই কথাটা আমার জীবন বদলে দিয়েছিল।’
তিনি বললেন, কীভাবে ছাত্রদের ভুলে না গিয়ে, তাদের সুখ—দুঃখে পাশে থাকার চেষ্টা করেছেন। কত ছাত্র জীবনের ভয় কাটিয়ে উঠেছে তাঁর পরামর্শে, কতজন আবার হার মানেনি শুধু তাঁর কথায় ভর করে।
‘ক্লাসে আমি যতবার পড়িয়েছি, ভেবেছিÑতোমাদের বইয়ের বাইরে কোনো শিক্ষা দিতে পারি। সেই শিক্ষা হলো সততা, সহমর্মিতা আর সাহস।’
চুপ হয়ে গেলেন তিনি। বাইরে হাওয়ায় আমগাছের পাতা দুলছে। রোদের আলোতে তাঁর মুখ যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। এই মুহূর্তে কেউ কথা বলছে না।
হঠাৎ প্রিয়াঙ্কা (শ্রেণির সবচেয়ে দুষ্টু মেয়েটি) দাঁড়িয়ে বলল, ‘স্যার, আমরা আপনার শেখানো কথা ভুলব না। আপনি যেমন বলেছিলেন, ভালো মানুষ হওয়াই বড় শিক্ষা।’
অনিরুদ্ধ স্যারের চোখ ভিজে উঠল। তিনি ধীরে ব্ল্যাকবোর্ডের দিকে হাঁটলেন, হাতের চক দিয়ে লিখলেন—‘শিক্ষা শেষ নয়, শেখা চলতেই থাকে।’
লেখাটি যেন পুরো ক্লাসের অন্তরে গেঁথে গেল। ঘণ্টা বাজার শব্দে সবাই চমকে উঠল। ক্লাস শেষ। কিন্তু কেউ বেরোতে চায় না। স্যার একটি উষ্ণ হাসি দিয়ে দরজার দিকে এগোলেন। পেছনে সূর্যের আলো পথজুড়ে ঝরে পড়ছে, যেন কোনো প্রদীপের শিখা নিভে যাওয়ার আগে শেষবার ঝলসে উঠছে।
করিডরের মোড়ে দাঁড়িয়ে স্যার একবার ফিরে তাকালেন; ক্লাসের প্রতিটি ছাত্র দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধার নিঃশব্দ অভিবাদন জানাচ্ছে। সেই মুহূর্তে বোঝা যায়, একজন শিক্ষক শুধু স্মৃতিতে নয়, জীবনের অনুপ্রেরণায় চিরকাল বেঁচে থাকেন।
বিষ্ণুপুর, বাঁকুড়া, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত