শিক্ষক যখন জীবনের লক্ষ দেখায়

‘তিনজনই পারেন একটি দেশ বা জাতিকে বদলাতে। তারা হলেন বাবা, মা ও শিক্ষক।’ এপিজে আবদুল কালাম ছাত্ররা যদি দেশ গড়ার হাতিয়ার হয়ে থাকে, তাহলে বলা যায় শিক্ষকগণ হলেন সেই হাতিয়ার তৈরির কারিগর।

লাবনী আক্তার কবিতা
পড়তে লাগবে 4 মিনিট

বর্তমানে যেখানে শিক্ষা একটি ব্যবসা ও অসুস্থ প্রতিযোগিতা হয়ে গেছে, সেখানে এমন কিছু শিক্ষক আছেন, যারা শুধু পড়ানোই নয় বরং শিক্ষার্থীদের মধ্যে জ্ঞানপিপাসা সৃষ্টি করছেন।

তারা বারবার প্রমাণ করছেন যে, একজন শিক্ষকের কাজ শুরু পড়ানোতেই সীমাবদ্ধ নয় বরং শিক্ষার্থীদের সঠিক মানুষ হিসেবে তৈরি করা। তাইতো এই সকল শিক্ষক আমাদের মনে জায়গা করে নেন। হয়ে যান আমাদের প্রিয় শিক্ষক। তাই সকল শিক্ষকদের প্রতি সম্মান জানিয়ে আজকে আমার প্রিয় শিক্ষকের কথাই বলব।

আমার নাম লাবনী আক্তার কবিতা। মানুষের ছোটবেলায় অনেক কিছু হওয়ার স্বপ্ন থাকে, কিন্তু আমার এরকম কিছু ছিল না। আর না তো আমার কোনো প্যাশন ছিল। আমি শুধু এগিয়ে যাচ্ছিলাম, সময়ের মতো, যার কোনো লক্ষ্য নেই।
আজকের গল্পটা ২০১৭ সালের ঘটনা। আমি সবে মাত্র হাইস্কুলে ভর্তি হয়েছি। নতুন স্কুল, কারও সাথেই তেমন পরিচয় হয়নি। তবে নতুন স্কুলে আমার সবচেয়ে পছন্দের ছিল আমার শ্রেণি শিক্ষিকা, তাঁর নাম রঞ্জনা বড়–য়া, বিখ্যাত কবি সুকুমার বড়–য়ার মেয়ে। ম্যাম দেখতে ভীষণ সুন্দর, আর ভীষণ কোমল মনের মানুষ; আমাকে খুব ভালোবাসতেন। একদিন ক্লাসে হাজিরা নেওয়া হচ্ছিল। যেহেতু নতুন ক্লাস, তাই রোলের সাথে সবার পুরো নাম ডাকা হচ্ছিল। আমার রোল ছিল ১০।

ম্যাম ডাকলেন: রোল দশ, লাবনী আক্তার কবিতা। আমি কিছু বলার আগেই ম্যাম বলে উঠলেন, এই তোমার নাম কবিতা, তাহলে তুমি কবিতা লিখবে।’ আগেই বলেছি, আমার কোনো লক্ষ্য, প্যাশন কিছুই নেই। পড়াশোনা ছাড়া নিতান্ত কোনো কাজও করতে হয় না। তাই ভাবলাম, ম্যাম যখন বলেছেন, তাহলে লেখা—ই যায়, চেষ্টা করে দেখি, ম্যাম খুশি তো হবেন।

তাই লিখে ফেললাম কবিতা। জীবনের প্রথম কবিতাটা ম্যামকে নিয়েই লেখলাম। ম্যাম দেখলেন, প্রশংসা করলেন। ব্যাপারটা এখানেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারত অথবা গতানুগতিক শিক্ষক হলে এখানেই সীমাবদ্ধ থাকত। কিন্তু ব্যাপারটার বিস্তৃতি ছিল বহুদূর।
একদিন ম্যাম আমাকে অফিসে ডেকে একটা ফরম ধরিয়ে দিয়ে বললেন, ‘এটা পূরণ করো, কবিতাটা কাগজে লিখে, খামে করে, পত্রিকার অফিসে পাঠিয়ে দাও।’ পত্রিকার অফিসের ঠিকানাটাও লিখে দিলেন।
মনে মনে বললাম, ‘ধুর! কোথায় ফেঁসে গেলাম।’ তারপর বাসায় এসে অনেক চিন্তা করে, ম্যামের কথামতো পাঠিয়েই দিলাম। শুধু ম্যামের কথা রাখতেই পাঠিয়েছিলাম। অন্য কোনো আশা বা উদ্দেশ্য আমার ছিল না।

একদিন দুপুরে স্কুল বন্ধ, আরাম করে ঘুমাচ্ছি, এমন সময় ম্যাম কল দিলেন। ধরলাম, ওপাশ থেকে ম্যাম বললেন, ‘লাবনী তোমার কবিতা তো পেপারে বের হয়েছে।’ ম্যামের কথাটা আমার বিশ্বাস করতেই অনেক সময় লাগল, প্রথমে ভাবলাম হয়তো স্বপ্নই দেখছি। কিন্তু তখন কী জানতাম হাতের মুঠোয় স্বপ্ন পেয়েছি।
এরপর থেকে ম্যাম আমাকে লেখায় উৎসাহ দিলেন। আমি আরও লিখতাম, কবিতা প্রকাশিত হতো, একটা সময় লেখালেখি আমার নেশা হয়ে গেল। লক্ষ্যহীন জীবনে লেখালেখিকেই একটা লক্ষ্য হিসেবে নিলাম। তাইতো আজও লিখে চলছি।

দুনিয়াতে নামহীন কোনো মানুষ আপনি খুঁজে পাবেন না, ঠিক তেমনই লক্ষ্যহীন কোনো মানুষও নেই। আসলে লক্ষ্য ছাড়া মানুষ থাকতেই পারে না, প্রকৃতি তাকে কোনো না কোনোভাবে লক্ষ্য দিয়ে দেয়। আর সবাইকে সেটা অনুসরণ করতেই হয়। আমি আমার নামের মাধ্যমে নিজের লক্ষ্য পেয়েছি।

এই দুনিয়াতে আমরা কিছুই নিয়ে আসি না, বিদায়ও নিই খালি হাতে কিন্তু নাম হলো এমন একটা জিনিস, যা একান্তই ব্যক্তিগত। সবার নামের না—কি অর্থ থাকে। কাজ করে নাম করা যায়। কিন্তু আমার গল্পটা ভিন্ন, আমি নাম অনুযায়ী কাজ করছি। এখন লেখালেখি আমার ভীষণ পছন্দ। মানুষ সময় পেলে নিজের পছন্দের কাজ করে আর আম নিজের পছন্দের কাজ আগে করে বাকি সব পরে করি।

আমি কোনো বড় লেখক হতে পারিনি কিন্তু আমার আফসোস নেই, আমি আমার লক্ষ্য তো পেয়েছি। কিন্তু এই যে লক্ষ্য পেলাম, তার পেছনে ম্যামের অবদান কি ভোলা যায়? তাই ম্যাম আমার জীবনের এক অনুপ্রেরণা হয়ে রয়েছেন। একজন শিক্ষকের যেমন সবাই প্রিয় ছাত্র/ছাত্রী হয় না, তেমনই শিক্ষার্থীর সব শিক্ষক প্রিয় হতে পারে না। সবার আলাদা আলাদা জায়গা থাকে।

ম্যাম শুধু আমার প্রিয় নন বরং আমার জীবনের অন্যতম সেরা শিক্ষিকা। যিনি আমাকে শুধু শিক্ষা নন, জীবনের লক্ষ্য দিয়েছেন।

লোক প্রশাসন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

শেয়ার করুন
মন্তব্য নেই

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।