আমার দেহ আমার ইচ্ছে

আমার দেহ আমার ইচ্ছা এই নীতি অনুযায়ী আমরা চলি। আমরা অধিকাংশ শিক্ষিত মেয়েরা আত্মনির্ভরশীলতার জন্য এই‌ নীতিকে প্রাধান্য দিই। আমি জিন্স পরব না টি-শার্ট পরব, ওড়নাটা বুকের ওপর রাখব, না গলায় প্যাঁচিয়ে রাখব, আমি আমার বয়ফ্রেন্ডের সাথে রুমডেটে যাব কি যাব না—এগুলো একান্তই আমার ব্যক্তিগত বিষয়। তা ছাড়া গনতন্ত্র ও মানবাধিকার এ বিষয়ে আমাকে পরিপূর্ণ স্বাধীনতা ও অধিকার দিয়েছে।

জামাল হোসেন
পড়তে লাগবে 5 মিনিট

আধুনিকতার মধ্যেই নারীদের প্রকৃত সৌন্দর্য প্রদর্শিত হয়। তোমার মতো আপাদমস্তক‌ কাপড়ে ঢাকা ঢিলাঢালা পোশাকে কী আর আছে? এটি বলেই নাফিসা হনহন করে সামনে দিকে এগিয়ে গেল। তার বন্ধু-বান্ধবীদের সাথে ফ্রি মিক্সিং আড্ডা দেওয়া শুরু করল।

পরেরদিন হাফসা ভার্সিটিতে এসে প্রথমেই নাফিসার কাছে গিয়ে বলল, গতকাল তো আমাকে কিছু বলার সুযোগ দিলে না।‌ কিছু বলার আগেই অন্যত্র চলে গেলে। শোনো, তুমি যে আধুনিকতা, উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপনকে অধিকার আর ইচ্ছেমতো নিজেকে পরিচালনা করাকে স্বাধীনতা বলছ, সেটির উৎপত্তিস্থলে রূপ-সৌন্দর্যের গুরুত্ব ব্যাপক থাকলেও দিনশেষে তা কিন্তু ডিপ্রেশন ও আত্মহত্যার দিকে ধাবিত করে।

– যতক্ষণ তোমার কাছে রূপ লাবণ্য আছে, ততক্ষণ বৈশ্বিক পাশ্চাত্য সংস্কৃতির বিস্তৃতি তোমাকে জাস্ট প্রোডাক্ট মনে করে। তোমাকে না বরং তোমার রূপ সৌন্দর্যকে খোলামেলা বাজারে ছেড়ে দিয়ে তারা নিজ স্বার্থ উদ্ধার করতে চায়। এটির পেছনে পাশ্চাত্যের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও আছে। উদাহরণস্বরূপ প্রথমেই মেয়েদের ওপর থেকে ব্যক্তিগত অধিকারের নামে ধর্মীয় কর্তৃত্বকে সমূলে ধ্বংস করে দেওয়া হয়। এটির ফলে ভালো-মন্দ বিচারের মাপকাঠি ধর্মীয় শিক্ষা, ইসলামি মূল্যবোধ ও নৈতিকতার পরিবর্তে ব্যক্তিগত ইচ্ছাকে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়। ব্যক্তিগত ইচ্ছা যখন কোনো নারী-পুরুষের চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে, তখন সে নিজের অধিকার নিজেই প্রতিষ্ঠা করে নেয়।
যেমনটা দেখা যায়, সমকামীদের মধ্যে, নারীবাদীদের ও মুক্তচিন্তাধারীদের মধ্যে তারা সমষ্টিবদ্ধ হয়ে দেশি-বিদেশি এনজিও-এজেন্সির সহায়তায় নিজেরাই নিজেদের অধিকার তৈরি করে ধর্মীয় কর্তৃত্বকে বিনাশ করে চলছে।

ধর্মীয় কর্তৃত্ব তো আমাদের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও কাজ করতে সম্মতি দেয় না। আমরা কি ধর্মীয় কর্তৃত্বের বেড়াজালে নিজেকে পুরোপুরি আটকে না রেখে ইসলাম পালন করতে পারি না। মানে আমি আমার ইচ্ছানুযায়ী চলব, সেইসাথে যতটুকু পারি ইসলামকে মানব।

– তোমার এ ধারণাটি অবান্তর। কেননা তুমি তোমার কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছার জন্য যদি দুই নৌকায় পা রাখ, তাহলে ফলস্বরূপ কোনো নৌকাতেই স্থান পাবে না। তুমি পড়ে যাবে খরস্রোতা নদীর অতল গভীরে এবং শেষমেশ তুমি তোমার কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছে যাওয়ার পরিবর্তে জীবনটাই হারাবে। ঠিক একইভাবে তুমি যদি ধর্মীয় কর্তৃত্ব ও ধর্মীয় বিধানকে আংশিক মেনে চলো। আবার আমার দেহ, আমার ইচ্ছা এই ভ্রষ্টনীতি অনুযায়ী জীবনকে পরিচালনা করো। তাহলে ঐ দুই নৌকায় পা দেওয়া ব্যক্তির মতো তুমিও খরস্রোতা নদীতে পড়ে মারা যাবে।
তা ছাড়া নাফিসা তুমি বল, ধর্মীয় কর্তৃত্ব তো আমাদের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও কাজ করতে সম্মতি দেয় না। এই কথাটি পুরোপুরি অযৌক্তিক। ইসলামে নারীদেরকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিপূর্ণ অনুমতি দেওয়া হয়েছে সেটি সাংসারিক জীবনে হোক কিংবা পারিবারিক জীবনে কোনো অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত হোক। কিন্তু পাশ্চাত্য সভ্যতার শেখানো অধিকারগুলো এবং তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পন্থা তো কোনোভাবেই মুসলিম নারী পুরুষরা মেনে নেবে না।

পাশ্চাত্যের সিদ্ধান্তানুযায়ী নারী-পুরুষ উভয়েই কর্মক্ষেত্রে ব্যস্ত। এজন্য তাদের সিদ্ধান্তানুযায়ী অশীতিপর বৃদ্ধ মা-বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। কারণ বাসায় তো তাদের দেখাশোনা করার মতো কোনো ব্যক্তিবর্গ নেই। এভাবে দিনদিন তাদের পারিবারিক বন্ধন ভেঙে যাচ্ছে।
কিন্তু আমরা কি তা করতে পারব? না আমরা জানি হাদিসের সেই আলোকিত বানী, ‘মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত।’ পিতা-মাতাগণই সন্তানের জান্নাত ও জাহান্নামের সার্টিফিকেট। এই সার্টিফিকেটে ভালো নম্বর পাওয়া গেলে তবেই জান্নাত নসিব হবে।
পাশ্চাত্যের সিদ্ধান্তানুযায়ী সর্বত্রই নারী-পুরুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কিন্তু দিনশেষে তারাই মা-বাবার সম্পত্তির সমান অধিকার তো দূরের কথা, ন্যায্য অধিকারটুকুও দেয় না।

কিছু গবেষণা পত্রের মতে, অস্ট্রেলিয়ায় বহু প্রজন্মের পারিবারিক খামারগুলো সাধারণত পুত্রদের কাছে হস্তান্তরিত হয়। একটি জরিপে দেখা গেছে, কন্যাসন্তানদের মাত্র ১০% ক্ষেত্রে উত্তরাধিকারী হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে, বাবা-মা ইচ্ছা করলে তাদের সম্পত্তি যেকোনোভাবে বণ্টন করতে পারেন, যার ফলে অনেক সময় কন্যাসন্তানরা সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হন। ন্যাশনাল ব্যুরো অব ইকোনমিক রিসার্চ (ঘইঊজ)। এর এক গবেষণায় দেখা যায়, পরিবারগুলো প্রায়ই পুত্রদেরকে বেশি সম্পদ দেয় উত্তরাধিকারে।

এক সমীক্ষায় দেখা যায়, ৬০% বাবা-মা তাদের ছেলে সন্তানদের প্রতি ‘উন্নয়নের বিনিয়োগ’ (যেমন: জমি, ব্যবসা) করতে আগ্রহী, যেখানে মেয়েদের ক্ষেত্রে এই হার ৩০%। অনেক পরিবারে বিশ্বাস করা হয়, ছেলে সন্তান ভবিষ্যতে পরিবার চালাবে, তাই সম্পত্তি তার জন্য উপযুক্ত।
জার্মানির গধী Max Planck Institute for Social Law and Social Policy এর এক রিপোর্টে বলা হয়, পিতামাতারা প্রায়শই ছেলেদের অর্থনৈতিকভাবে বেশি সহায়তা করেন। উত্তরাধিকার বণ্টনে ছেলেরা মেয়েদের তুলনায় গড়পড়তায় ১৫-২০% বেশি সম্পদ পান।

Canadian Centre for Policy Alternatives এর গবেষণা বলছে: পরিবারের মধ্যে সম্পদ হস্তান্তরের সময় প্রায় ৭০% সম্পত্তি ছেলে সন্তানদের দেওয়া হয়। বিশেষ করে পারিবারিক ব্যবসা বা জমির ক্ষেত্রে মেয়েরা প্রায়শই বাইরে থাকেন। Irish Longitudinal Study on Ageing (TILDA) অনুযায়ী: বয়স্ক পিতামাতাদের মধ্যে যারা উইল তৈরি করেছেন, তাদের মধ্যে ৬৫% ছেলেকেই প্রধান উত্তরাধিকারী করেছেন।
প্রকৃতপক্ষে পাশ্চাত্যে ছেলেদেরকে ‘উত্তরসূরি’ ও মেয়েদেরকে ‘অতিথি’ হিসেবে ভাবার প্রবণতাটি স্পষ্ট বিদ্যমান। কিন্তু ইসলাম ধর্ম সম্পত্তি বণ্টনসহ যাবতীয় পারিবারিক ও উত্তরাধিকার সম্পর্কিত বিষয়াবলিতে নারী-পুরুষ উভয়কেই উত্তরসূরি হিসেবে মূল্যায়ন করেছে এবং ন্যায্যতার ভিত্তিতে অধিকার নিশ্চিত করেছে।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

শেয়ার করুন
মন্তব্য নেই

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।