মুহূর্তেই যেন ফিরে গেলাম সেই জুলাইতে। বিপ্লবের আগুন জ্বালে উঠল পুরো সমাবেশজুড়ে। কী আগুন লিরিক্স! তারপরে আরও কতবার এই গান শুনে উদ্বীপ্ত হয়েছি। সেই গানের লেখক শরিফ ওসমান হাদি। সেই থেকে পরিচয়। দিনেদিনে তাকে আরও দেখেছি, চেনার চেষ্টা করেছি। একটা সময় আশ্চর্যের সাথে লক্ষ করলাম, তার চিন্তাভাবনাগুলো আমাকে দারুণভাবে আকৃষ্ট করছে, কাছে টানছে। আর কেনই-বা করবে না? এই দেশে তার মতো স্পষ্টবাদী আর যোগ্য কয়জন আছে এই দেশে? শরিফ ওসমান হাদি হয়ে গেলেন হাদি ভাই।
শুরুর দিকে ভাই কথা বলতেন কেবল। বলতেন আমাদের প্রাণের কথাগুলো। যে কথা বলতে সাহস করত না অন্যরা, সেইসব কথা হাদি ভাই উচ্চকণ্ঠে বলতেন। সংবাদ সম্মেলন থেকে টকশো, মঞ্চ থেকে সেমিনার—সবখানেই বলতেন আজাদির কথা, নতুন বাংলাদেশের কথা।
কিছুদিন পর ভাই ইনকিলাব কালচারাল সেন্টার করেন। শুরু করেন নতুন লড়াই। আমাদের বলেন বইপড়ার কথা। বই কালেকশন করেন মানুষের দুয়ারে-দুয়ারে গিয়ে। মাঝে মাঝে যাই কালচারাল সেন্টারে। বই দেখি, পড়ি। দেখি, কী দারুণ করে হাদি ভাই সাজাচ্ছেন তার স্বপ্নের বাগান! কালচারাল লড়াইকে এগিয়ে নেওয়ার কী প্রাণান্তকর চেষ্টা!
নতুন করে শুরু করেন এককালাপ নামের একটা অনুষ্ঠান। জ্ঞানী-গুণীরা এসে বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করেন। হাজিরা ফাঁকি দিয়ে মাঝে মাঝে যাই। আমাদেরকে উৎসাহ দেওয়ার জন্যই বোধহয় হাদি ভাই বসে থাকেন সামনের কাতারে। আমরা শুনি, বুঝতে চেষ্টা করি লড়াইয়ের সাতসতেরো।

ওসমান হাদি ভাই নির্বাচন করবেন—আসন ঢাকা-৮। তেমন গুরুত্ব দিলাম না। এ তো স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু প্রচারণা শুরু করতেই সবার ফোকাস চলে গেল তার দিকে। তিনি প্রচারণা শুরুই করলেন গ্রামবাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য মিলাদ পড়ে, বাতাসা বিলিয়ে। ফজর পড়ে শুরু করেন ভোটারযোগ। চারদিকে যখন বয়ে যায় স্নিগ্ধ সুবাতাস, হাদি ভাইয়ের নির্বাচনী প্রচারণা সেই পরিবেশকে আরও স্নিগ্ধ করে তোলে।
ভাই মানুষের কাছে যান। পায়ে হেঁটে ঘুরে বেড়ান সবখানে। মানুষের অন্যরকম ভালোবাসা পান। একদিন ঘোষণা দিলেন, “আমি নির্বাচনে নিজের একটা টাকাও খরচ করব না। আমি নির্বাচিত হলে তো আপনাদের লাভ, তাই আপনারাই আমাকে টাকা দেবেন।” এবং কী আশ্চর্য—মানুষ দুহাত ভরে টাকা দিল। একজন চা-ওয়ালা যখন হাদি ভাইয়ের হাতে তুলে দিল এক হাজার টাকা, তখন বিস্মিত না হয়ে তো উপায় নেই। আরেকজন পকেটে ঢুকিয়ে দিলেন টাকার বান্ডিল।
এইসব দৃশ্য এই দেশে—যেখানে নির্বাচন করার প্রস্তুতি নিতেই প্রার্থী জোগাড় করে কোটি টাকা—সেখানে খুবই দুর্লভ আর খানিকটা যেন বেমানান। এই মানুষটা, যার স্লোগান হলো ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’, সত্যিই যেন পরিবর্তন নিয়ে এলেন। নির্বাচনী সংস্কৃতি আর আবহ—সবখানেই পরিবর্তনের ছোঁয়া দিলেন।
ওসমান হাদি জনমানুষের হয়ে উঠলেন একান্তই নিজের প্রচেষ্টায়। কে ভেবেছিল অচেনা এই তরুণ মানুষটি এ রকম ভালোবাসা পাবে? এত সব ব্যস্ততার মধ্যেও ওসমান হাদি তার মূল লড়াই চালিয়ে যান—সাংস্কৃতিক লড়াই। কালচারাল ফ্যাসিস্টদের বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠে আওয়াজ তোলেন। সবাইকে লড়াই করার মতো যোগ্য হতে আহ্বান জানান।
সাধারণত সব প্রার্থী বাইক বা গাড়ি নিয়ে শোডাউন করে। হাদি ভাই করলেন ভ্যান নিয়ে। শোডাউন শেষে ছিল কনসার্ট। সেখানে হাদি ভাই আবৃত্তি করলেন নজরুলের কবিতা। অমিত তেজ আর ঝংকার ছিল সেই কণ্ঠে। নজরুল তার কবিতা মনে হয় এভাবেই আবৃত্তি করতেন।
সেই আবৃত্তি নিয়ে শাহবাগ-পাড়া কত হাসিঠাট্টা করল। যে শিল্প-সাহিত্যকে নিজেদের সম্পত্তি ভাবত ওরা, আর ব্যবহার করত নিজের স্বার্থে, হাদি ভাই বীরের মতো সেটা ফিরিয়ে আনলেন। নজরুল যে কেবল বাম-পাড়ার নয়, তা ওদের বুঝিয়ে দিলেন কড়ায়-গন্ডায়। কালচারকে কালচার দিয়ে মোকাবিলা করেছেন সব সময় এবং জয়ী হয়েছেন।
আনন্দমুখর এই সময়গুলো পেরিয়ে গেল, যখন হাদি ভাই গুলিবিদ্ধ হলেন। ফেসবুক খুলেই এই সংবাদ দেখে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেলাম। নিশ্বাস আটকে যাচ্ছে যেন। আমার ভাইয়ের মুখজুড়ে রক্ত। হাসপাতালে নেওয়ার পরে কত মানুষের ভিড় জমে গেল। কে যেন চিৎকার করে উঠল, “ওসমান, আমাদের ছেড়ে যাস না ওসমান!”
সারাদেশ একটা মানুষের জন্য দোয়া করছে। তিনি কোনো এমপি-মন্ত্রী ছিলেন না। ছিলেন কেবলই একজন যোদ্ধা। তবুও সবাইকে কাঁদিয়ে চলে গেলেন শরিফ ওসমান হাদি—এক শুভ শুক্রবারে। তার জানাজায় এসেছিল পুরো দেশ। কেঁদেছে সবাই। কেউ হারিয়েছে ভাই, কেউ হারিয়েছে সেনাপতি। আর বাংলাদেশ হারিয়েছে তার শ্রেষ্ঠ সন্তান। শরিফ ওসমান হাদি আর ফিরবেন না। তবে রয়ে যাবেন আমাদের সাহসের বাতিঘর হয়ে। তিনি আজাদির লড়াইতে আমাদের অনুপ্রেরণা। জীবনের চেয়ে দৃপ্ত মৃত্যু তখনই জানি, শহিদের খুনে হেসে ওঠে যবে জিন্দেগানি।
মোহাম্মদপুর, ঢাকা