শহিদ ওসমান হাদি: ইতিহাসের বুকে এক কালজয়ী অধ্যায়

কিছু মৃত্যু শিরোনাম হয়, আর কিছু মৃত্যু ইতিহাসের বুকে ক্ষত হয়ে বসে থাকে। শহিদ ওসমান হাদির মৃত্যু তেমনই এক ক্ষত। যা সময়ের পালা বদলে শুকিয়ে যাওয়ার কথা থাকলেও তা শুকায় না; বরং প্রতিটি ভোরে নতুন করে রক্ত ঝরিয়ে ক্ষতকে তরতাজা করে দেয়।

তৌসিফ রেজা আশরাফী and উসমান বিন আবদুল আলিম
পড়তে লাগবে 5 মিনিট


শহিদ শরীফ ওসমান হাদি ১৯৯৩ সালের ৩০ জুন ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন। শহিদ হাদির বাবা একজন মাদরাসা শিক্ষক ছিলেন। ভাই-বোনদের মধ্যে হাদি সর্বকনিষ্ঠ। ইতিহাস কখনো যায়, কিন্তু ওসমান হাদি সেই তালিকার অন্তর্গত নন। তিনি কেবল একটি নাম ছিলেন নন। তিনি ছিলেন এক প্রশ্ন। রাষ্ট্রের কাছে, সমাজের কাছে এবং সময়ের কাছ

মাত্র ৩২ বছর বয়সি ওসমান হাদি নিজের দৃঢ় মানসিকতা, দেশপ্রেম, সত্যনিষ্ঠা ও আদর্শবোধের কারণে দেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে তিনি ছিলেন একজন সম্মুখ সারির নেতৃত্বদানকারী শক্তি এবং ভারতীয় আধিপত্য বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম মুখপাত্র।
শহিদ ওসমান হাদি ‘ইনকিলাব মঞ্চ’ নামক একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন; এ ছাড়াও ওসমান হাদি ঢাকা-৮ আসনে সংসদসদস্য নির্বাচনের প্রার্থী ছিলেন। তিনি রাজনীতিকে ক্ষমতার সিঁড়ি হিসেবে নয়, বরং দায়িত্বের ভার হিসেবে দেখতেন। তিনি ভোটের অপসংস্কৃতি ও কালো টাকার ঘোর বিরোধী ছিলেন। শহিদ হাদির কাছে জনগণের সমর্থনই ছিল মূল শক্তি। তিনি নিজের ব্যক্তিত্বকে আদর্শিক মানদণ্ডে পরিণত করেছিলেন। যখন রাজনীতি অধিকাংশের কাছে সুবিধা নেওয়ার শিল্প হিসেবে পরিচিত, তখন শহিদ ওসমান হাদির কাছে রাজনীতি ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর ভাষা। তিনি বিশ্বাস করতেন জনগণের পক্ষে কথা বলাই রাজনীতির সর্বোচ্চ নৈতিকতা।

তাঁর কণ্ঠ ছিল ক্ষুরধার, তবে বিদ্বেষপূর্ণ নয়। বক্তৃতায় ছিল আগুন, তবে পোড়াবার জন্য নয় আলো দেওয়ার জন্য। শহিদ ওসমান হাদি ছিলেন একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক ও বিপ্লবী। তিনি হাতে সংস্কারের মশাল নিয়ে বেরিয়েছিলেন রাষ্ট্রনীতির সকল কুসংস্কার দূরীকরণের জন্য।
তিনি চাইলে কোনো দলীয় পতাকার তলে নিরাপদ রাজনীতি করতে পারতেন, কোনো প্রভাবশালী দলে নিজেকে অন্তর্ভুক্ত করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি, কারণ এতে তাঁর প্রশ্ন করার সুযোগ সীমিত ও সংকুচিত হয়ে যেত। তিনি সব সময় সাধারণ মানুষের পাশে থেকে তাদের মনের ভাষা ও দুঃখ-কষ্ট অনুভব করার চেষ্টা করেছেন

হাদির সবচেয়ে বড়ো শক্তি ছিল তাঁর সৎসাহস। অন্যায়, অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন আপসহীন। বিপ্লবকে গুলির মাধ্যমে স্তব্ধ করার অপসংস্কৃতি বাংলাদেশে নতুন কিছু নয়। গত ১২ ডিসেম্বর দুর্বৃত্তদের গুলিতে গুলিবিদ্ধ হয়ে ১৮ ডিসেম্বর তিনি তিরোধানের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন।
আজ শহিদ ওসমান হাদি আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু রেখে গেছেন এক আদর্শবোধ। কথায় আছে বিপ্লবী মরলেও বিপ্লব মরে না। বিপ্লবীর রক্তে জন্ম নেয় হাজার হাজার নতুন বিপ্লবী। ঠিক তেমনই ওসমান হাদি এ দেশের তরুণদের হৃদয়ে আপসহীন ও আধিপত্য বিরোধী চেতনার বীজ বপন করে গেছেন।

তিনি দেখিয়েছেন দেশপ্রেম অন্তরে থাকলে যত বড়োই অপশক্তি থাকুক না কেন, তা টিকতে পারে না। তিনি ছিলেন একজন আদর্শ বিপ্লবীর মূর্তপ্রতীক। ক্ষণজন্মা ওসমান হাদি আমাদের সামনে একটি আয়না তুলে ধরেছেন সত্য বলা কি অপরাধ?
শহিদ ওসমান হাদি কি কখনো নিজের স্বার্থের কথা বলতেন? না, কখনোই না। তিনি বলতেন বাংলাদেশ ও এ দেশের মানুষের কথা। তিনি ব্রাহ্মণ্যকুল তথা ভারতের পররাষ্ট্রনীতির সমালোচনা করতেন। দেশের জনগণকে সচেতন করার জন্য তিনি নানা যুক্তিনির্ভর বক্তব্য দিতেন। তাঁর এই কথাগুলোই একসময় কাল হয়ে দাঁড়ায়।
ওসমান হাদি মনে করতেন রাষ্ট্র শক্তিশালী হয় ভিন্নমত দমন করে নয়, বরং মতের ভিন্নতাকে ধারণ করে। কিন্তু কঠিন বাস্তবতা হলো আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি এখনও এমন মতবাদ সহ্য করার মতো পরিণত হয়নি।

শহিদ ওসমান হাদিকে ত্রিশবারেরও অধিক ভারতীয় নাম্বার থেকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি বিন্দুমাত্র বিচলিত হননি। দৃপ্ত পদে এগিয়ে গেছেন। অতি অল্প সময়েই হাদি এ দেশের মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিতে পেরেছেন।
ওসমান হাদি নিজের ধ্যান ও জ্ঞান নিবেদিত করেছিলেন এ দেশের মানুষের জন্য। তিনি ছিলেন অনলবর্ষী বক্তা। তাঁর বক্তৃতায় প্রতিবাদ হয়ে উঠত ভাস্বর। শহিদ হাদি জাতিকে এক সূত্রে বেঁধেছেন। জাতির ক্লান্তিলগ্নে সবাইকে এক পতাকার তলে ঐক্যবদ্ধ করেছেন।
শনিবার, ২০ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় হাজারো মানুষের অংশগ্রহণে হাদির নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দের উপস্থিতি পরিলক্ষিত হয়। সেদিন বাংলাদেশে অন্যতম বৃহৎ জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

মানুষ অনুচ্চারিত শব্দে শহিদ হাদির জন্য প্রার্থনা করে মহান আল্লাহ যেন তাঁর এই মৃত্যুকে শহিদি মর্যাদা দান করেন। হাজারো মানুষ অশ্রুসিক্ত নয়নে এই মহান বিপ্লবীকে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের পাশে সমাহিত করেন।
শহিদ ওসমান হাদি প্রত্যক্ষভাবে আমাদের মাঝে উপস্থিত না থাকলেও তিনি আগামীর ইতিহাসে বেঁচে থাকবেন এক কালজয়ী অধ্যায় হিসেবে। হাদির রক্তরঞ্জিত জামা যুগ যুগ ধরে বিপ্লবীদের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
হাদি আজ কোনো ব্যক্তি নন, তিনি এক আদর্শ, এক আপসহীন সত্তা, এক নৈতিক দ্রোহ। ওসমান হাদি আমাদের শিখিয়ে গেছেন কীভাবে দেশ ও দেশের জনগণের জন্য নিজের প্রাণ নির্বিঘ্নে উৎসর্গ করতে হয়।
ইনকিলাব জিন্দাবাদ!

লেখক ও শিক্ষার্থী

শেয়ার করুন
মন্তব্য নেই

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।