কথায় আছে, ‘চলে যাওয়ার চেয়ে রেখে যাওয়ার জ্বালাতন তীব্র।’ রোজ করে কলম মেরামতের আদতটাও বিলীন হয়ে যাচ্ছে অনীহার তিক্ত বাতাসে। কলবটা আর আগের মতো সাড়া দেয় না লেখালেখি-আবৃত্তির ডাকে, এই মরজকে কী বলে আখ্যা দেবো খুঁজে কূলকিনারা পাচ্ছি না।
অলসতা? না-কি হৃদয় ব্যাধি? নির্ঘাত সেকেন্ডটাই হবে। সময়ের গতিতে দৌড়াচ্ছে সপ্তাহ, পক্ষ, মাস। এভাবে কি জীবন তরি চলে? এই সূক্ষ্ম রোগের নিরাময় যে অনিবার্য। ‘দাওয়া’র দরকার প্রতিনিয়ত রুটিন করে। আচ্ছা এই রোগের পহেলা কারণ কী হতে পারে? এত্ত রুটিন মেন্টেইন করা লোক অকস্মাৎ কেনই-বা এমন রোগের প্রেশেন্ট হলাম? কোনদিন থেকে হলাম? কেন প্রিয় ডায়েরিটার প্রতি অনীহা জন্মালো? আসলেই কি আমি এমন? শান্ত মেজাজে প্রশ্ন ছুড়ে দিলাম নিজেকে।
(ক) ঝিরঝির অনুভূতির চাহনি আমার দুর্বল ব্রেইন নিউরনে। যেন সাগরে উতাল ঢেউ ক্যানালের বুকে, বাঁধ ছিঁড়ে যায় যায় অবস্থা। হৃদকোমলকে দীর্ঘ ফুচতাজ করে একটাই আনসার মিলল। কী হবে এই সাহিত্যচর্চা করে লেখক হয়ে! একজন লেখকের ধন, মন, তন, জীবন, এমনকি রিসার্চ, সবই কুরবান করে দেয় জাতির জন্য। উদ্দেশ্য? সমাজটা চেঞ্জ হোক, অন্ধকারাচ্ছন্ন উম্মাহ হক চিনুক, সত্য-মিথ্যার তফাৎ বুঝুক। আসুক অন্ধকার ছেড়ে আলোর ছায়াতলে।

সেই সত্যই যদি প্রতিনিয়ত বিক্রি হয় অর্থের বিনিময়ে তাহলে এত কষ্ট-ক্লেশের কী জরুরত? কী কদর এই সাহিত্যচর্চার! প্রশ্নের জবাব আর ফিকির করতে গিয়েই আঁখিদয় জলে টইটুম্বুর, চশমার গ্লাসটা ফ্যাকাশে করে দিচ্ছে জগতের আলোকে। অশ্রুজলের স্রোত আর বাধ মানছেই না। শুনছে না নিজেকে দেওয়া নিজের সান্ত্বনার বুলিগুলো। ভাগ্যিস চার দেওয়ালের দালানকোটায় বন্দি ছিলাম, দরজার লকটা ছিল মজবুতে। না হলে ডজন কয়েক প্রশ্নের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হতো নিজেকে। ফ্যামিলির একেক মেম্বারের ভিন্নধর্মী প্রশ্নের আঘাতে আরও জর্জরিত করত শোকাহত কলবকে।
(খ) আজ মন নিজের পরম আত্মাকে গালাগাল করছে অকথ্য ভাষায়, তুই কেন ফোন হাতে নিলি? কেনইবা ফেসবুক মোবাইল স্ক্রলিং করলি? তাহলে হয়তো নজর কাটত পোস্টখানা। স্ক্রলিং করলি তা মেনেই নিলাম, কেন বললি ‘হাদি’ আর নেই? আজ তাহলে এমন কিছুই হতো না। আরও কত কী! আসলেই কি তা-ই? আমার স্ক্রলিং-পোস্ট পড়াই কি গুনাহের মূল? আরে না, নিজেকে সামলানোর নয়া ফাঁদ। না হলে যে শোকের গহ্বরে ডুবে খতম হয়ে যাচ্ছি এক এক করে। কেন এমন হলো? কেন মস্তক গুলিবিদ্ধ হলো দেশপ্রেমিক এক তরুণ টিচারের? কী গুনাহ ছিল ইমানদীপ্ত শহিদি পিপাসু ছদ্মনামে গর্জে ওঠা এই কবির? ওহ, মনে হয় রাজনীতি অঙ্গনে ভোটপ্রার্থী হওয়াটাই তার জিন্দেগির চরম গলত। তাই মাশুল হিসেবে দিতে হলো প্রাণ। না! তাহলে ভোটপ্রার্থী তো মেলা আছে, তারা কেন মরল না? না-কি সমীকরণের চাকা অন্যদিকে! ইনিয়ে-বিনিয়ে না বলে সহজিয়া ভাষায় বললে অন্য দেশে! ওসমান হাদি (রহ.) ছিলেন মনে-প্রাণে, রক্তেমাংসে, বক্তব্যে আমাদের পিছুটান বন্ধুসুলভ ভারতবিরোধী তরুণ নায়ক।
কারণ নয়-ছয় করে এই উম্মাহকে আর ধোঁকা দেওয়া সম্ভব নয়, এই ভারত আমাদের কোনো কালে বন্ধু ছিল না। ছিল আপনের ভূমিকা পালন করে ঘর লুট করা ভিনদেশি। যুগে যুগে আমাদের সমৃদ্ধির মাঝখানে দাঁড়িয়ে যাওয়া ছায়াহীন প্রাচীর। যাদের মূল মিশন ছিল আমাদের চাল-ডাল দিয়ে তাদের দুঃখের নদী সুখের সাগরে পরিণত করা। আমাদের মাথায় নুন রেখে বরই চিপকানো ছিল তাদের চিরাচরিত অভ্যাস।
এ সময়ে আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর একটা কথা খুব মন পড়ে, তিনি বলেছিলেন ‘যে প্রজন্ম বুঝতে শিখবে আসলে ভারত আমাদের কোনো কালেই বন্ধু ছিল না, তারাই সোনার প্রজন্ম।’ ঠিক তা-ই, এ প্রজন্ম ধীরে ধীরে ভাসানীর পথ ধরেই বেড়ে উঠেছে, হতে চলেছে ঘোর ভারতবিরোধী। যার প্রমাণের আলোকবর্তিকা শহিদ ওসমান হাদি (রহ.)।
এই বাঙ্গু সুশীল, নোটের ধরে বিক্রি হওয়া এলিটরা নিতে পারেনি আমার ভাইয়ের জবানের সহিহ শব্দকে। নিতে পারেনি ভিনদেশি গুরুর প্রতি হুশিয়ারির লফজে গর্জে ওঠা প্রদীপকে। সহ্য হয়নি জাতির পুঙ্খানুপুঙ্খ হকের হিসাব চাওয়া এই শিক্ষিত পেন-নোটবুককে। কারণ, হকের গর্জন তিক্ত হলেও যে সত্য, আর সত্য কাটা হয়ে দাঁড়ায় মুনাফিক-বেঈমান, লুটেরাদের চুরি পথে। তাইতো বন্দুকের নিশানায় টার্গেটে পরিণত হলো আমার ভাইয়ের প্রজ্ঞায় ভরা আস্ত মস্তক। বিষে যন্ত্রণায় একরাশ আফসোস নিয়ে পাড়ি জমাতে হলো পর জগতে। আহ মাবুদ!
(গ) জানেন তো! আমার জ্ঞানহীন মাথা নিজেকে প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে জর্জরিত করে অলটাইম। ঘুমোতে দেয় না গভীর রজনীতেও। প্রশ্নের ধরনটা এমন। আমাদের প্রশাসন কী করল? বিচারব্যবস্থা কী করল? ঘটনার বহু ঘণ্টা পরে এত টহল বাহিনী মজুদ থাকার পরেও কাতেল কীভাবে সীমান্ত ক্রস করল? মাসে মাসে লক্ষ লক্ষ বেতন-ভাতা পাওয়া জজ, ব্যারিস্টার, আইনজীবী, প্রুফ হাতে থাকা সত্ত্বেও কার চুলটা ছিঁড়ল? এই মাটিতে কে নিরাপদ? এই জাতি হাদির ফুটফুটে কচি সন্তানের পিতার স্নেহ কী দিয়ে ফুরাবে?
নব বিধবার সাজধারী রমণীর সান্ত্বনার ঝুলিতে কী বাণী দিয়ে আশ্বাস দেবে? সন্তান খোয়া মায়ের কী হবে? আজ একচল্লিশ দিন চলমান, নেই কনস্টেবল থেকে রাষ্ট্রপ্রধান কারও কোনো মাথাব্যথা। আছে শুধু থুতলি ভরা কপটতা আর ভার্চুয়াল জগতে তীব্র নিন্দার ঝড়। কুরসি টেকাতে মিথ্যা অভিনেতার কী নিদারুণ রোলপ্লে। ওই বাঙ্গু সেক্যুলারপাড়াই সুকুতের বন্যা বিরাজমান, নেই কোনো সাড়া শব্দ। অথচ চুন থেকে নুন ঘষলেই এদের মাতামাতির সীমা থাকে না। ইসলাম নিয়েই এদের যত্তসব মাথাব্যথা আর গবেষণা। নিজেদের আবার সুশীল এলিট বলেও দাবি করে, ঠাঁই দিতে চায় মহত্ত্বের মসনদে। শরয়ি নিষেধাজ্ঞার কারণে, না হলে একেকটাকে গুণী অভিনেতার নোবেলে ভূষিত করতে বড্ড মন চায়। কথায় আছে না! ‘চোর বহিরাগত হলে সংসার টেকানো যায়, ঘরের রমণী চোর হলে সংসার টেকানো বড়ো দায়।’ আমাদের হালত তেমনই। নিজেরাই কাতেল-মাকতুল, নিজেরাই উকিল-জজ। আচ্ছা, এই অন্যায়ের সাজা কি সম্ভব? দেবে এই সুশীল সেক্যুলার, এলিটরা? না কি আবরার ফাহাদের কেইচের মতো পড়ে থাকবে অবহেলিত কোন এক আইন টেবিলে। যুগের পর যুগ কাটলেও আসবে না তার সহিহ সমাধান। সত্যিই এ মাটি এক মৃত্যুপুরী, এ দেশে আমরা কেউই নিরাপদ নয়।
ইয়া আরশের অধিপতি আমাদের হিদায়াত ভূষিত করুন। আমিন।
ইক্বরা আইডিয়াল, চট্টগ্রাম।