পুকুর ডোবানো বললেও তো হতো, কিন্তু এই অঝোর বৃষ্টিতে পুকুর-ডোবা সব যেন এক হয়ে গেছে| তিনতলায় ফ্ল্যাটের বেলকুনিতে গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে এসব ভাবছে বৃষ্টি| এই বর্ষাকালটা এর একদম ভালো লাগে না| ভালো না লাগার কারণও আছে কিছু| কত কথা, কত কষ্ট জমা হয়ে আছে মনের ভেতর| ওর নামটা যে কেন ‘বৃষ্টি’ রেখেছিল ওর বাবা-মা! সেজন্য খুব রাগ হয় ওর| বৃষ্টির দিনে কাদা প্যাঁচপ্যাঁচে রাস্তা আর ঘরের কোণে বন্দি হয়ে থাকা দুটোই ওর একদম অসহ্য লাগে|
একমনে জানালার ধারে বসে বৃষ্টি পড়া দেখছে ও| খুব জোরেশোরে বৃষ্টি হচ্ছে| চারদিকে কেমন ঝাপসা| বেশি দূরের কিছুই ঠিকমতো দেখা যাচ্ছে না| আজ স্কুলটাও ছুটি, তাই মনটা আরও বেশি খারাপ| সারাদিন একা একা ঘরে বসে থাকতে কারই-বা ভালো লাগে! স্কুলে থাকলে ঝড়-বৃষ্টি হলেও বান্ধবীদের সাথে হাসি-আড্ডায় সময় কেটে যায়, তখন আর বৃষ্টিকে বিরক্তিকর লাগে না| কিন্তু যত বিপত্তি এই বাসায় একা থাকলে| কম্পিউটারে গেম খেলতে খেলতেও মনটা কেমন বিষিয়ে উঠেছে| তাই আনমনা হয়ে দাঁড়িয়ে জানালার গ্রিল ধরে বাইরে তাকিয়ে ছিল বৃষ্টি|

এমন সময় হঠাৎ ওর দৃষ্টিটা পাশের নির্মাণাধীন বিল্ডিংয়ের নিচের দিকে গিয়ে আটকে গেল| সেখানে দুই-তিনটি ছোটো ছেলেমেয়ে ভেজা ছেঁড়াফাটা জামা গায়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে ঠান্ডায় থরথর করে কাঁপছে| দৃশ্যটা দেখে বৃষ্টির বুকের ভেতরটা কেমন হুঁ হুঁ করে উঠল| ও মনে মনে ভাবল, ‘এই পথশিশুদের কি আব্বু-আম্মু নেই? থাকলে ওদের এমন অযত্ন-অবহেলায় ফেলে রেখেছে কেন? ওনারা কি কোনো কাজ করেন না? কাজ করলে তো অন্তত মাথার ওপর একটা ছাদ থাকার কথা| তাহলে কেন ওরা এভাবে কষ্ট পাচ্ছে?’ এমন হাজারো প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে থাকে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ুয়া বৃষ্টির মনে|
পরক্ষণে ও আবার নিজেই নিজেকে উত্তর দিলো—‘কষ্ট তো ওদের হবেই! ওদের যেদিন এনে দিন খেতে হয়| ওদের আব্বু-আম্মু তো আর আমার আব্বু-আম্মুর মতো বড়ো চাকরি করে না|’
বৃষ্টি ওর বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান| দুজনেই বড়ো পদে চাকরি করেন| তাই বৃষ্টিকে কোনো অভাবই বুঝতে দেন না| ওর জন্মের সময় খুব বৃষ্টি হয়েছিল বলেই শখ করে নাম রেখেছিলেন ‘বৃষ্টি’| তবে মেয়েকে তাঁরা কোনো কিছুর অভাবের জন্য চোখের পানি ফেলতে দেন না| বরং চাওয়ার আগেই সব হাজির করেন| অভাব আসলে কী জিনিস, সেটা বৃষ্টির অজানাই ছিল| কিন্তু আজ ও একটা বড়ো অভাব বুঝতে পেরেছে| সেটা হলো—মানবতার অভাব| নইলে কি আর জ্যান্ত মানুষগুলো ওভাবে কাকভেজা হয়ে ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে? বৃষ্টির ছাঁট বারবার হানা দিচ্ছে ওদের ওপর| মানবতা থাকলে অবশ্যই কেউ ওদের এই দুরবস্থা দেখে এগিয়ে আসত|
এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়েছে, বৃষ্টি টেরই পায়নি| মায়ের ডাকে ওর হুঁশ ফেরে| দুপুরের খাবারের জন্য ওকে ডাক দিলেন মিসেস বাদল খান|
—‘বৃষ্টি, খেতে আয়|’
মায়ের ডাক শুনে সব চিন্তা ঝেড়ে ফেলে ও ডাইনিং টেবিলে গেল| কিন্তু টেবিলে ধোঁয়া ওঠা ভুনা খিচুড়ি| তা দেখেই মেজাজটা খারাপ হয়ে গেল ওর|
এমনিতেই বৃষ্টির ওপর রাগ, তার ওপর আবার এই খাবার! একগাল রাগে মুখ ফুলিয়ে বসে রইল| মেয়ের অবস্থা দেখে মা বুঝতে পারলেন| হেসে বললেন, ‘কী হয়েছে রে? বৃষ্টির দিনে তো খিচুড়িই সবার প্রিয়| ওই যে, জনি সিদ্দিকের ওই ছড়াটা পড়িসনি? কী যেন নাম? কী যেন নাম? ও হ্যাঁ, মনে পড়েছে| “বৃষ্টি বিলাস”| বৃষ্টি বিলাস ছড়াটা বেশ মজার—
‘বৃষ্টি পড়ে টুপটাপ
ঘরে সবাই চুপচাপ
মুড়ি মাখা খায়,
দুপুর কিংবা সাঁঝে
ডিম ভাজারই ঝাঁঝে
ক্ষুধা বেড়ে যায়|
মায়ের হাতের ছোঁয়া
গরম গরম ধোঁয়া
খিচুড়িতে পাই,
মন-মাতানো ঘ্রাণে
দোলা লাগে প্রাণে
মজা করে খাই|’
মায়ের মুখে খিচুড়ি-বৃষ্টির ছড়া শুনে ও আর চুপ থাকতে পারল না| বলে উঠল, ‘আম্মু! রাখো তোমার কবিতা আর খিচুড়ির ঐতিহ্য! কখনো কি একটু রাস্তার পথশিশুদের কথা ভেবে দেখেছ?’
পথশিশুদের কথা শুনে মা অবাক হয়ে ওর দিকে তাকালেন|

বৃষ্টি তবুও বলে চলে—‘ইস! কী কষ্টই না ওরা করছে| বৃষ্টির জন্য আজ ওদের আব্বু-আম্মু কাজ করতে পারেনি, তাই হয়তো ওদের আজ কিছুই খাওয়া হবে না| তোমরা যদি দুই-চার দিন অফিসে না-ও যাও, তবুও তো মাস শেষে বেতন ঠিকই পাবে; কিন্তু ওরা একদিন কাজ না পেলে অনাহারে থাকে| তোমরা কেন ওদের কষ্টটা বুঝতে চাও না? আমার খুব কষ্ট হয় ওদের দুঃখ দেখে|’
বাবা বাদল খান পাশ থেকে মৃদু হেসে বলে উঠলেন, ‘ওয়াও! আমার আম্মু দেখি অনেক বড়ো হয়ে গেছে, অন্যের কষ্ট বুঝতে শিখেছে| এটা খুব ভালো কাজ|’
তারপর একটু থেমে আবার বললেন, ‘কিন্তু মামণি, আমরাও তো বুঝি| তবে কী করব বলো? সারাদিন অফিস করে এসে যেটুকু সময় পাই, তা বিশ্রাম নিতেই চলে যায়|’
বৃষ্টির এবার অভিমান ছাপিয়ে জেদ চলে এলো| ও বলল, ‘পাপা, এই তোমাদের মতো লোকেদের জন্যই ওদের এত কষ্ট! তোমরা আমাদের জন্য কত কিছু করো, অথচ ওদের বেলা শুধু সময় নেই বলে অজুহাত দেখাও| শুধু মুখে বড়ো বড়ো মিষ্টি কথা বললে কি ওদের পেট ভরবে? আচ্ছা পাপা, তোমাদের মতো বিত্তবানদের এই স্বভাবটা কি কোনো দিন যাবে না?’
মেয়ের মুখে এমন কথা শুনে মিস্টার ও মিসেস বাদল খান দুজনেই চুপ হয়ে গেলেন| তাঁরা কোনো কথা বলতে পারলেন না, শুধু অবাক হয়ে মেয়ের মুখের দিকে চেয়ে রইলেন| তাঁদের যে আর কিছুই বলার নেই| বাবা-মায়ের পাথরের মতো অবস্থা দেখে বৃষ্টি ঘাবড়ে গেল| চোখে জল চলে এলো| নিচু ¯^রে ধরা গলায় বলল, ‘মাই ডিয়ার ফাদার অ্যান্ড মাদার, প্লিজ ফরগিভ মি| আমি তোমাদের ছোটো করার জন্য এসব বলিনি| কিন্তু রাস্তার ধারের ওই অসহায় পথশিশুগুলোকে দেখে আমি নিজেকে সামলাতে পারলাম না| ওদের কষ্ট দেখে মনটা বড্ড ভেঙে গেছে|’
বৃষ্টির বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘না রে মা, আসলে দোষটা আমাদেরই| তুই একদম ঠিক বলেছিস| পথশিশুদের জন্য আমাদের মতো বিত্তবানদেরই এগিয়ে আসা উচিত| আর সেটা শুধু কথায় নয়, বরং বাস্তবে কাজ করে দেখাতে হবে|’
এই আলাপ-আলোচনার মধ্যেই বৃষ্টি কমে এলো| মেঘের ফাঁক দিয়ে সূর্যও উঁকি দিল আচমকা| বৃষ্টি খুব দ্রুত ওর স্কুলের টিফিন বাটির ভেতর কিছু খাবার নিল| তারপর দৌড়ে সেই বিল্ডিংয়ের নিচে গেল| কিন্তু পথশিশুদের আর সেখানে পেল না|
এদিক-ওদিক তাকিয়ে খুঁজতে লাগল| কিন্তু কোনো দিকেই খুঁজে আর পাওয়া গেল না| ও মুখ ভার করে ফিরে এলো খাওয়ার টেবিলে| ওর জন্য সাজানো খাবার টেবিলে পড়ে আছে, কিন্তু সেই পথশিশুরা কী খাবে? ওদের জন্য তো আর খাবার রেডি করা নেই! ওরা হয়তো খাবারের সন্ধানে সেই কাদা জলের মধ্যেই কোথাও বেরিয়ে পড়েছে…|
সালনা, গাজীপুর