ভাঙা জানালা এবং এক পশলা বৃষ্টি

অফিস শেষ করে বের হয়েছি| বাসে উঠতেই ঝুম বৃষ্টি। বৃষ্টির ঝাপটায় বাসের ভেতরটা ভিজে যাচ্ছে দেখে বাসের হেলপার জানালাগুলো খুব দ্রুত বন্ধ করে দিলো।

সৈয়দ আবদুল্লাহ আল মামুন
পড়তে লাগবে 3 মিনিট

অবশ্য সব জানালা বন্ধ করা সম্ভব হয়নি, কেননা ঢাকা শহরের লোকাল বাসগুলোতে জানালা থাকলেও জানালার অবস্থা থাকে করুণ। কোনোটার গ্লাস ভাঙা, তো কোনোটার পুরো জানালাই নেই। আমি যে সিটে বসেছিলাম সেটার জানালার কাচ একপাশে নেই। প্রচুর পানির ঝাপটা আসছিল দেখে পাশে অন্য একটি সিটে গিয়ে বসলাম।

এ সময়ে সবাই ক্লান্ত। সারাদিনে অফিসের একগাদা কাজ শেষ করে বাসায় যাওয়ার এই সময়টায় সবাই তাই খুব চুপচাপ থাকে। কয়েকজন কে দেখলাম ফোনে বুদ হয়ে আছে, কয়েকজন আধো-আধো ঘুমে। খুব অল্প কয়েকজন আছেন যারা মুগ্ধ হয়ে বৃষ্টি দেখছেন, আর আমি তাঁদের বৃষ্টি উপভোগ করতে দেখে আনন্দ পাচ্ছি।

সিট বদল করেও অবশ্য পানির ছাঁট থেকে পুরোপুরি রেহাই মিলল না। ভাঙা কাচের ফাঁক দিয়ে বৃষ্টির ছিটকে আসা জলবিন্দুগুলো ঠিকই আমার ডান কাঁধটা ছুঁয়ে যাচ্ছিল। তবে অদ্ভুত ব্যাপার হলো, এই ভেজা ভাবটা একটুও বিরক্তি ছড়াচ্ছিল না। বরং সারাদিনের ওই ফাইলপত্র, কি-বোর্ডের খটখটানি আর ব্যস্ততায় জমে থাকা ক্লান্তিটা এক নিমিষে ধুয়ে-মুছে সাফ করে দিচ্ছিল।

বাসটা তখন ফার্মগেটের চিরচেনা জ্যামে এসে আটকে গেছে। ইঞ্জিনের একটানা ভটভট শব্দ আর তার সাথে বাসের টিনের ছাদে বৃষ্টির তুমুল নূপুরধ্বনি সব মিলিয়ে বাইরে এক অদ্ভুত কোলাহল। অথচ বাসের ভেতরটা কী ভীষণ শান্ত! আমার ঠিক সামনের সিটে বসা মাঝবয়সি এক ভদ্রলোক, যাঁর কপালে একটু আগেও দুনিয়ার চিন্তার ভাঁজ ছিল, তিনি এখন সিটের পেছনে মাথা হেলিয়ে চোখ বুজে আছেন।

হয়তো মনে মনে সংসারের হিসাব মেলাচ্ছেন কিংবা বৃষ্টির এই চাদরে ক্লান্তিটাকে সঁপে দিয়ে একটু জিরিয়ে নিচ্ছেন। তাঁর পাশেই একটা ছেলে কানে ইয়ারফোন গুঁজে জানালার দিকে তাকিয়ে আছে। তার চোখে কোনো তাড়াহুড়ো নেই, এক অদ্ভুত মুগ্ধতা মাখানো স্থির দৃষ্টি। এই বৃষ্টি কি তাকে কোনো পুরোনো স্মৃতির গলিতে টেনে নিয়ে গেল?
আমি জানালার কাচহীন ওই শূন্যস্থান দিয়ে আবার বাইরে তাকালাম।

নিয়ন আলো আর গাড়ির হেডলাইটের লাল নীল আভা ছিটকে পড়ছে ভেজা রাস্তায়। পিচঢালা পথটা যেন একটা বিশাল আয়না, যেখানে পুরো শহরটা উলটো হয়ে কাঁপছের ফুটপাতের এক কোণে একটা ছোটো ছেলে চট চটে প্লাস্টিক মাথায় দিয়ে দাঁড়িয়ে হাস্য মুখে বৃষ্টিতে ভিজছে। ওর কোনো অফিসের তাড়া নেই, কাল সকালের ডেডলাইনের চাপ নেই। ওর ওই অনাবিল আনন্দটা দেখে বুকের ভেতরটা কেমন যেন হালকা হয়ে গেল।

হঠাৎ একটা তীব্র ঠান্ডা হাওয়া এসে আমার চুলে বিলি কেটে গেল। সেইসাথে মাটির একটা গন্ধ, যা এই কংক্রিটের ঢাকা শহরে বড্ড দুর্লভ। আমরা যারা প্রতিদিন নিয়মের জাঁতাকলে পিষ্ট হই, তারা ভুলেই যাই বেঁচে থাকার আনন্দটা আসলে কত সহজ হতে পারে।

বাসটা আবার ধীরগতিতে চলতে শুরু করল। কন্ট্রাক্টরের চিৎকারের মাঝেও আমি কেমন যেন এক অতল শান্তিতে ডুবে রইলাম। পকেট থেকে ফোনটা বের করে একবার সময়টা দেখার ইচ্ছে হলো, কিন্তু পরক্ষণেই হাতটা সরিয়ে নিলাম।

অফিস শেষের এই ক্লান্তিময় ঢাকা শহরটাকে আজ বড্ড আপন মনে হচ্ছে। বাসের এই ভাঙা জানালার পাশে বসে পাওয়া মন ভালো করা অনুভূতিটুকু আজ আমার সাথে বাড়ি পর্যন্ত যাবে, হয়তো থেকে যাবে তারও বেশি কিছু সময়।

উত্তর বাড্ডা, ঢাকা, বাংলাদেশ

শেয়ার করুন
মন্তব্য নেই

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।