মেঘপিওনের চিঠি ও এক পশলা নস্টালজিয়া

জন্মের পর আমার নানুমণি শখ করে নাম দিয়েছিলেন ‘নির্ঝর’| বলা হয় নামের সাথে নাকি মানুষের অভ্যাস বা আচরণিক মিল থাকে, বোধ করি আমার বেলায়ও তা-ই ঘটেছে| ছোটো বেলা থেকেই বৃষ্টি আমার ভীষণ পছন্দের| এর পেছনে অবশ্য দারুণ এক স্মৃতি লুকিয়ে আছে|

মুনকার তারান্নুম
পড়তে লাগবে 5 মিনিট

আমি তখন সবে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ি| আমার জগৎ সেসময় বাসা আর স্কুলের মাঝেই সীমাবদ্ধ| বাসা থেকে স্কুলের দূরত্ব খুব একটা বেশি নয় বিধায় হেঁটেই যাওয়া-আসা করতাম| সেসময়ের ক্ষুদ্র জীবনে স্কুলের প্রতি টান ছিল অগাধ|

এমনই একদিন পরিপাটি হয়ে স্কুল গেলাম, আকাশে ঝকঝকে রোদ আর এদিকে ক্লাস ভরতি ছাত্র-ছাত্রী সবাই হইচইয়ে মেতে আছে| প্রথম দুটো ক্লাস খুব সুন্দরভাবে সম্পন্ন হলো| এরপরের ক্লাস শেষ হলেই আমাদের টিফিনের ছুটি| এই সময়টার জন্য আমরা সবাই মুখিয়ে থাকতাম| টিফিনের ছুটি পেলেই কেউ চলে যেত দোকানে, কেউ আবার লাঞ্চবক্স হাতে মাঠে| যাদের বাসা কাছে তারা বাসায় গিয়ে খাবার খেয়ে আসত আর আমরা কয়েকজন ক্লাসরুমে বসেই টিফিন শেষ করতাম| অন্য দিনের মতই দুটো ক্লাস শেষে তৃতীয় ক্লাস শুরু হলো, তৃতীয় ক্লাস বাংলা| টিচার এসে একজনকে ক্লাসের সামনে দাঁড় করিয়ে ‘নেমন্তন্ন’ কবিতাটা জোরে জোরে পড়তে বললেন|

কবিতাটা সুন্দর তবে কারও বিশেষ একটা মনোযোগ দেখা গেল না| সবাই ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে টিফিন ছুটির ঘণ্টা পড়ার প্রহর গুনছে| কবিতার মাঝেই হুট করে আমরা গুড়ুম-গুড়ুম আওয়াজ শুনলাম, মেঘ ডাকার আওয়াজ| চকিতে সবাই জানালা আর বারান্দা দিয়ে উঁকিঝুঁকি মারতে লাগল| কবিতা পাঠকারী নিজেও কবিতা থামিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে| টিচার বললেন, ‘বৃষ্টি হবে বোধহয়’| আমাদের ঝিমিয়ে যাওয়া মন ততক্ষণে সতেজ হয়ে গেছে| আকাশ দ্রুত কালো হতে শুরু করেছে, বোঝা গেল ভালোই বৃষ্টি হবে আজকে|

আশেপাশে থাকা গাছগুলোর পাতা প্রবল বেগে নড়ছে| ক্লাসটিচার বললেন, ‘হয়েছে, ওদিকে তাকিয়ে থেকো না| সবাই ক্লাসে মন দাও|’ এমন দুর্দান্ত আবহাওয়ায় কারও মাঝে ক্লাস করার তেমন আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না, তাই সবাই একপ্রকার মুখ কালো করে বসে রইলাম| এমন সময় হুট করেই কাছে কোথাও ভীষণ জোরে বজ্রপাত হলো, সাথে সাথে বিদ্যুৎ চলে গিয়েছে| আমরা সবাই একসাথে জোরে চিৎকার দিয়ে উঠলাম| ভয়ে নয়, আনন্দে| আজ তাইলে আর ক্লাস হবে না| চারদিকে অন্ধকার, তিনজনের বেঞ্চিতে ইতোমধ্যে আমরা পাঁচজন গা ঘেঁষে বসে আছি|

শীতল আবহাওয়ার মাঝে গায়ের ওম আরাম দিচ্ছে| এদিকে আমাদের চিৎকার শুনে আরও দুজন শিক্ষক ক্লাসে চলে এলেন, বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে| ক্লাসে থাকা শিক্ষকরা আমাদের অভয় দিচ্ছেন, শান্ত থাকতে বলছেন| আমরা ভীষণ করে অনুরোধ করলাম, আজ আর কোনো ক্লাস করব না| প্রথমে দুই চারবার তাঁরা ‘না’ করলেন| আমরাও নাছোড়বান্দা, সবাই প্রমিস করতে শুরু করলাম সামনের সাময়িক পরীক্ষায় খুব ভালো রেজাল্ট করে শিক্ষকদের খুশি করব| শেষমেশ আমাদের শিশুসুলভ আবদার আর নাকোচ করা গেল না|

বিজ্ঞানের শিক্ষক বলে উঠলেন, ‘একদিন না হয় ওরা আনন্দ করুক| কত ক্লাস আসবে যাবে| আজকে নয়তো ওরা একটু শৈশবকে উপভোগ করুক|’ এদিকে এমন কথা শুনে আমরা আবারও চিৎকার দিয়ে উঠলাম, বাইরের তুমুল বৃষ্টির সাথে আমাদের চিৎকার মিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে| স্কুলের সামনে পানিতে থইথই করছে| আজকে আর মাঠে যাওয়া হবে না, যারা দোকানে আর বাসায় যেত তাদেরও যাওয়ার সুযোগ নেই| যদিও এমন আনন্দঘন পরিবেশে আমাদের ক্ষুধার অনুভূতি একটুও কাজ করছে না তবুও শিক্ষকরা এসে বলে গেলেন যারা বাসা থেকে টিফিন এনেছি সবাই যেন ভাগাভাগি করে খাই|

একটা বনকে টেনেটুনে ছিঁড়ে পাঁচ-ছয় টুকরা করে খাচ্ছি, কেউ সিঙ্গারা দুই ভাগ করে খাচ্ছে, কোথাও একটা ডিম চার টুকরা করে সবাই ভাগাভাগি করে খাচ্ছে| অনেকটা সময় এভাবে করেই পেড়িয়ে গেল, এক বেঞ্চে সবাই খাতা কলম নিয়ে খেলছে তো আরেক বেঞ্চে সবাই গল্প করছে| এর মাঝে বজ্রপাত হলেই সবাই মিলে তুমুল চিৎকার দিয়ে উঠি| একসময় বিকাল ৩ টা বেজে গেল, ৪ টা বাজলেই আমাদের স্কুল ছুটি| বৃষ্টি ততক্ষণে অনেকটাই কমেছে তবে একেবারে থেমে যায়নি| অন্যান্য দিন আমরা ছুটির ঘণ্টা পরার অপেক্ষায় থাকতাম| কিন্তু আজকর দিনটা ভিন্ন, কারও মাঝে বাড়ি ফেরার তাড়া দেখা গেল না| অল্প সময়ের মধ্যে বাইরে গোলযোগের আওয়াজ পেলাম| অনেকের অভিভাবক এসে গেছে বুঝতে অসুবিধা হলো না, শহরে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে, বাচ্চাদের একা যাওয়া সম্ভব না বলেই আজকে অভিভাবক সংখ্যা অনেকটা বেশি| সবার কেমন মন খারাপ হয়ে গেল|

শিক্ষকরা ব্যাগ গোছাতে তাড়া দিচ্ছেন, গল্পগুজব ছেড়ে সবাই যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে থাকল| আকাশ এখন অনেকটাই পরিষ্কার, যাদের অভিভাবক আসেনি শিক্ষকদের ফোন থেকে ফোন দেওয়া হলো| ধীরে ধীরে সবাই ক্লাসরুম ত্যাগ করে বের হতে থাকল| ক্লাস ক্যাপ্টেন হওয়ার দরুন ক্লাসের বোর্ড মুছে লাইট-ফ্যানের সুইচ নিভিয়ে সবার শেষে বের হলাম আমি| ততক্ষণে পুরো ক্লাসরুম ফাঁকা হয়ে গেছে| শূন্য-বিরান একটা ক্লাসরুম, অথচ কিছুক্ষণ আগে কতই না আনন্দ হলো, দেখে আমার মন কেমন করে উঠল| অতঃপর আমি নিজেও বের হয়ে গেলাম|

ঐ স্কুলে আমি চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্তই ছিলাম| এরপর কেটে গিয়েছে আরও ৮ বছর, কত বারিধারা পাড়ি দিলাম কিন্তু সেদিনের মত দিন আর কখনোই আমার জীবনে আসেনি, হয়তো আর আসবেও না| প্রাইমারি স্কুল পাড় করে হাইস্কুলও শেষ করে ফেলেছি, কিন্তু সেই বন-রুটি- ডিম ভাগ করে খাওয়া বন্ধু গুলোকে আর কোথাও খুঁজে পাইনি| হয়তো আবারও কোনো দিন দেখা হবে কোনো এক ঝুম বৃষ্টিতে আটকা পড়ে…

শেয়ার করুন
মন্তব্য নেই

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।