এ নিয়ে রোজিনার সাথে তার প্রায়ই ঝগড়া হয়। ‘মানুষের ঘুমের ঘোরে হার্ট অ্যাটাক হয়, বোবা ধরে, রাতে একা একা বাথরুমে যাইতে ভয় লাগতে পারে—এ ব্যাপারে তোমার এতটুকু খেয়াল নাই কেন? আমার তো মনে হয় তোমারে ডাকলে জাগবা তো দূরের কথা, কানের কাছে ঠাডা পড়লেও তোমার ঘুম ভাঙবে না’—রোজিনা বলে নাজিমকে। কিন্তু নাজিম যেই-সেই। ঝগড়াঝাঁটি, রাগ-অভিমান সবই অরণ্যে রোদন হয়ে দেখা দে।
কিন্তু আজ আর নাজিম ঘুমিয়ে থাকতে পারল না। শরীরে পানির স্পর্শে ঘুম ভেঙে লাফিয়ে উঠে বসে। হতভম্ব হয়ে সে অনুভব করে ঘরে খাট সমান পানি। রোজিনা তার আগেই জেগেছ। ছেলেমেয়ে দুটোকে ঘুম ভাঙ্গিয়ে তারা বাইরে বেরিয়ে আসে। বাইরে উঠানে বানের পানি নদীর স্রোতের মতো বয়ে যাচ্ছে। তার সাথে ক্রমশেই ভেসে আসতে থাকে মানুষের চেঁচামেচি-চিৎকার ও কান্নার আওয়াজ।

এ অঞ্চলের মানুষ বন্যার সাথে পরিচিত। প্রতিবছর বর্ষার সময় যখন নদীতে বান ডাকে, বানের পানি হামাগুড়ি দিয়ে এসে তলিয়ে দেয় বিস্তীর্ণ ফসলের নিচু মাঠ, চলাচলের রাস্তা-ঘাট। এ অঞ্চলের বসত-ভিটাগুলো তাই বেশ উঁচু করে বানানো হয় পানি থেকে বাঁচার জন্য। তবে ভারত যখন বাধ খুলে দেয়, তখন পানি মাঠঘাট ছাড়িয়ে উঠানেও এসে পড়ে। এমনকি কখনো কখনো ঘরেও ঢুকে যায়। তবে তা সাময়িক সময়ের জন্য। যত দ্রুত আসে পানি তত দ্রুত নেমেও যায়। তা ছাড়া ভারত গেট খোলার আগে সতর্ক ঘোষণাও দেয়। আজকালের মধ্যে তো এমন কোনো ঘোষণা আসেনি, তাহলে এখন! এই রাতে হঠাৎ এত পানি কোত্থেকে আসলো? এবার কি তবে ভারত বাধ খুলে দিয়েছে এ দেশকে না জানিয়েই? ভেবে কূলকিনারা করতে পারে না নাজিম।
এদিকে হুহু করে পানি বেড়েই চলেছে প্রতি মুহূর্তে। একটু আগে ছিল খাট অবধি এখন খাটের উপরেও এক হাত পানি। নাজিমের বিশ্বাস হয় না—এত পানি তার এক জীবনের সে কখনো দেখেনি। দেখেনি বানের স্রোতের এমন ভয়াবহ তেজ। সে নিজে মনে মনে বেশ ঘাবড়ে গেলেও পরিবারকে অভয় দেয়ার জন্য বলে, ‘ঘর থাইকা বাইর হও সবাই, ডরের কুনো কারণ নাই। বান আইছে আবার নাইমাও যাইবো। তয় অহন ঘরে থাহন নিরাপদ হইব না। গাঁয়ের সবার ভাইগ্যই আমাগো ভাইগ্য।’
উঠানে তখন স্রোতের তোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা দায় হয়ে পড়েছে। কাঠ চেরাইয়ের মতো বুকের দুপাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া বানের স্রোতে ভাসিয়ে নিতে চাইছে সকলকে। ছেলেমেয়ে দুটোও কাঁদতে শুরু করে দিয়েছে ভয়ে। ‘কাঁদিস না, কিয়ের ডর ! আমি আছি না?—নাজিম সান্ত্বনা দেয় ওদের। ‘দে সাঁতার দে’—বলে এরপর সবাই মিলে নিজেদের ভাসিয়ে দেয় স্রোতের বিছানায়।
অন্ধকারের সাঁতার কাটতে থাকে ওরা। কোথাও দাঁড়াবার জায়গা নেই, পানি নাক অবধি ছাড়িয়েছে সবখানে। সব মানুষের সাথে ওরা তাই ভাসতে থাকে দিক-দিশাহীন। ‘তোরা আমার পাশে পাশে থাক’—সাঁতার কাটতে কাটতে বলে নাজিম। রোজিনা আছে নাজিমের পিছে। এভাবে ঘণ্টাখানেক সাঁতার কাটার পর সবার পেশি দুর্বল হয়ে আসে। ছেলেমেয়ে দুটো ক্লান্ত হয়ে এখন বাবার কোমর ধরে আছে। সবাই একটুখানি বিশ্রামের জন্য হাঁসফাঁস করতে থাকে। শরীর যে আর চলে না। কিন্তু কোথায় বিশ্রাম নেবে? তবু বাঁচার তাকিদে এগিয়ে যেতে থাকে পানির ভেলা অবলম্বন করে। এরই মধ্যে হঠাৎ নাজিম শুনতে পায় রোজিনার আর্তনাদ।

সে বুঝতে পারে রোজিনা ডুবে যেতে শুরু করেছে। কিন্তু সে যে ভীষণ অসহায় এক স্বামী এই মুহূর্তে। যে একটুপর নিজেকেও বাঁচাতে পারবে কি না তাও জানে না সে। চাইলেও এখন যেহেতু রোজিনার কোনো উপকার করতে পারবে না, তাই বুকে পাথর বেধে প্রাণাধিক প্রিয় স্ত্রীকে পিছে ফেলে এগিয়ে যেতে থাকে অন্ধকারে। একটু এগোনোর পর ছেলেমেয়ে দুটোকেও তার অসহনীয় মনে হতে থাকে। অথচ ওরা কলিজার দুটি টুকরা। কী করেই বা ওদের সে মৃত্যু-স্রোতে ছেড়ে দেয়! শরীরের সব শক্তি জড়ো করে আরও কিছুক্ষণ সাঁতার কাটলেও ক্রমেই নিস্তেজ হয়ে আসতে থাকে শরীর।
এ অবস্থায় দুটি সন্তানের ভার বহন করা তার জন্য দুঃসাধ্য মনে হয়। বেঁচে থাকার তীব্র তাকিদে সে এবার ওদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। তাতে ভয় পেয়ে ওরা আরও মরিয়া হয়ে আঁকড়ে ধরে থাকে তাকে। বেঁচে থাকার এই সংকটাপূর্ণ মুহূর্তে সব মায়াই তুচ্ছ। নাজিম পিতৃত্বের বুকে লাথি মেরে সন্তান দুটিকে ছাড়িয়ে দেয় নিজের দেহ থেকে। ওরা অন্ধকারে পানির স্রোতে হারিয়ে যায় চিৎকার করতে করতে। নাজিম যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচে| ওরা সন্তান নয় বোঝা ছিল। সে তাদের চেনে না। সে কারও পিতা না। সে মহাজগতের এক ক্ষুদ্র জীব; যেখানে বেঁচে থাকার জন্য প্রতি মুহূর্তে লড়াই করতে হয়।
সেই লড়াইয়ে যে জিতে যায় শুধু সেই বেঁচে থাকার অধিকার পায়। ‘আইজ কেয়ামত, আইজ কেয়ামত’—নাজিম ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে আওড়ায়। তারপর কোনো অদৃশ্যের প্রতি তীব্রক্ষোভে পশুর মত চিৎকার করে ওঠে পাগলের মত হাত-পা ছুড়তে শুরু করে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই পুরোপুরি নিস্তেজ হয়ে আসে তার সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গ। ক্লান্ত, বিধ্বস্ত দেহকে চিৎ করে দিয়ে হাত-পা ছোড়া বন্ধ করে দেয় সে। চোখ মুখ দিয়ে পানি ঢুকতে শুরু করেছে তার। সে কি কান্নার চেষ্টা করে? বোঝা যায় না। ঘোলা পানির ঢেউয়ে মিশে সব একাকার হয়ে যায়।
এতক্ষণে রাতের গা থেকে ভোরের গন্ধ ভেসে আসতে শুরু করেছে। সুবহে সাদিকের অস্পষ্ট শুভ্র রেখা কুঁজো বুড়োর মতো দেখা দেয় আসমানের বুকে। নাজিম যেন দেখতে পায় তার পরিবার ডুবে যায়নি, ওইত তারা উড়ছে তার চোখের সামনে। আলতা পায়ে শুভ্র শাড়িতে কী অপরূপ লাগছে তার রোজিনাকে। তার পাশে শাদা পোশাকে মেয়েটাকে মনে হচ্ছে ছোটপরী আর ছেলেটা যেন সাক্ষাৎ দেবদূত। কী সুন্দর, কী সুন্দর!
রোজিনা তাকে ডেকে বলে,
—তুমি অমন চিৎ হয়ে আছ কেন? চলে আস আমাদের সাথে।
ছেলে-মেয়েরাও ডাকে—বাবা চলে এসো।
নাজিম লজ্জিত ভঙ্গিতে জানতে চায়,
—তোরা রাগ করে নেই তো আমার উপর?
—না বাবা, আমরা রাগ করিনি। আমরা তোমাকে ক্ষমা করে দিয়েছি।
—তোদের খুব কষ্ট হয়েছে নারে?
—আমাদের তখন কষ্ট হলেও দেখ আমরা কত ভালো আছি এখন| এখন আর আমরা ডুবব না| তুমিও এসে পড়| সবাই আবার একসাথে হলে আরও বেশি মজা হবে—একথা বলে মেয়েটা হাত বাড়িয়ে দেয় নাজিমের দিকে|
নাজিমও ওদের সাথে মিলাবে বলে হাত তুলতে চায়। কিন্তু তার শরীরটা তখন ধীরে ধীরে ডুবে যাচ্ছে বানের অতল পানিতে।
লোহাগড়া, নড়াইল