অটো মাঝপথে আসতে না আসতেই মুষলধারে ঝুমবৃষ্টি শুরু হলো। তাড়াতাড়ি অটোর পলিথিনের পর্দাটা মেলে দিই। কিন্তু বৃষ্টি এত জোরে হচ্ছিল যে, পলিথিন সরে গিয়ে বৃষ্টির পানি আমার গায়ে লাগছিল। আমার পাশেই ইন্টারমিডিয়েট কলেজ পড়ুয়া এক ছোটো ভাই বসে ছিল। আমার গায়ে বৃষ্টির ছিটা আসতে দেখে সে বলে, ‘আপু, আপনার শরীরে তো বৃষ্টির পানি লাগছে। পর্দাটা ভালোমতো দেওয়া হয়নি।’ আমি বললাম, ‘না, আমার তেমন অসুবিধা হচ্ছে না।’

কিন্তু ছোটো ভাই কোনো কথা শুনেনি। সে নিজে আমার দিকের পর্দাটা ভালো করে গুছে দেওয়ার চেষ্টা করল।
কিন্তু পর্দাটা বারবার বৃষ্টির ঝাপটায় সরে যাচ্ছিল। দেখলাম, আমি যতক্ষণ অটোতে বসে গন্তব্য পর্যন্ত আসছিলাম, ততক্ষণ পর্যন্ত ছেলেটি পর্দাটা ধরে দাঁড়িয়ে ছিল। আমি তাকে অনেকবার বসতে বললেও সে বসেনি।
ছেলেটির আমার প্রতি বিনয়সূচক ব্যবহার আমাকে বেশ মুগ্ধ করেছিল। আমার আপন কোনো ভাই নেই। ঐ ছেলেটির বিনম্র ব্যবহার দেখে মনে হলো, যদি আপন ভাই থাকত, সে নিশ্চয়ই তাই করত, যেটা ছেলেটি করেছে।
কেবল তাই ই নয়, আমি নামার সময় সে গলা বাড়িয়ে বলেছিল, ‘আপু ,সাবধানে যাবেন।’
আমি বললাম, ‘আচ্ছা, ঠিক আছে, ভাই। তুমিও সাবধানে যেয়ো।’
দুই:
বৃষ্টিমুখর দিনে কোনো এক পরিচিতজন
এক বাদলা দিনের ঘটনা। সময়টা আষাঢ়ের প্রথম দিকে। আমি কলেজে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। তখন আকাশ ঘন কালো মেঘে আচ্ছন্ন। আরেকটু পরেও এক পশলা বৃষ্টি শুরু হবে। তাই, ছাতাটাও সাথে রাখলাম।
মেঘলা দিনের শান্ত প্রকৃতিকে সঙ্গী করেই কলেজে গেলাম। ক্লাসের ফাঁকে ঝিরিঝিরি বাতাসের মিষ্টি পরশ মনকে পুলকিত করে গেছে। ক্লাস শেষে বাসায় ফেরার জন্য রিকশা উঠলাম। আকাশে তখন কালো মেঘ ঘনীভূত হচ্ছে। এখন মুষলধারে বৃষ্টি হবে বোঝা গেল। বাতাসের সাথে পাল্লা দিয়ে রিকশা ছুটে চলল বাসার দিকে। কিন্তু বিধি বাম। বাসার কাছাকাছি একটা মোড়ের কাছে আসতেই মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হলো। তাই রিকশা থেকে নেমে ভাড়া মিটিয়ে একটা শেডের নিচে দাঁড়াতে হলো বৃষ্টি থামার অপেক্ষায়।
প্রায় আধঘণ্টা ধরে প্রকৃতির এই সমধুর সংগীতায়োজন উপভোগ করলাম।
তারপর বৃষ্টির বেগ কিছুটা কমল। টিপটিপ বৃষ্টি মাথায় করেই ছাতা হাতে বাসার উদ্দেশ্যে হাঁটা দিলাম। তখনই পিছন থেকে এক আপু ডেকে বলল, ‘এই শুনো, তুমি কি এই সোজা পথে যাবে?’
আমি হ্যাঁসূচক মাথা নাড়ালাম।

আপু বলল, ‘তাহলে আমাকেও দয়া করে তোমার সাথে নেবে। আমিও ওইদিকেই যাব।’
আমি বললাম, ‘হুম, নিশ্চয়ই। আসেন, কোনো সমস্যা নেই।’
আপুকে আমার ছাতার নিচে নিয়ে একসাথে হাঁটতে লাগলাম। অপরিচিত একজনের সাথে হাঁটছি। মনে হাজার প্রশ্ন উঁকি ঝুঁকি দিলো।
আপু হঠ্যাৎ জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার বাসা কোন দিকে?’
আমি বললাম, ‘এই তো কাছেই| প্রায় এসেই পড়েছি|’
আমি যখন বাসার কাছাকাছি এসে কালো গেট খুলে ঢুকতে যাচ্ছি, তখন আপু চমকে গিয়ে বললেন, ‘তুমি এই বাসায় থাকো!’
আমি বললাম, ‘হুম, আমি এই বাসার তিন তলায় ভাড়া থাকি।’
আপু পুলকিত হয়ে বললেন, ‘তাই , তাহলে তুমি নাজনীন আপার (আম্মুর নাম) মেয়ে। দেখেছো পাশাপাশি থাকি। অথচ কোনো দিন দেখা হয়নি| পরিচিত হয়ে ভালো লাগল।’
আমি বললাম, ‘আমি আম্মুর মুখে আপনার কথা শুনেছি। আজ দেখা ও পরিচিত হয়ে ভালো লাগল।’
আকুয়া জুবিলী কোয়ার্টার, ময়মনসিংহ।