সেই সময়টা ছিল প্রচণ্ড অনাবৃষ্টির। খালে পানি নেই, বিলের ঢালুতে জোয়ার নেই। পুব আকাশে জলীয় বাষ্প ঘনীভূত হয়ে মেঘের সৃষ্টি হতো ঠিকই, কিন্তু বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ত না। শুধু গুমোট গরম আর অস্থির করা বাতাস। মাটি যেন তৃষ্ণায় ফেটে যাচ্ছিল, গাছের পাতাগুলোও ক্লান্ত হয়ে মাথা নিচু করছিল।
সেই রাতটা ঘুমে-অঘুমে কেটে গেল। নানি বলছিল, রাতের প্রথম প্রহরেই নাকি এক ধমকা বাতাসে কড়ই গাছের ডাল ভেঙে কারেন্টের তারের ওপর পড়েছে, তাই সারা রাত আর বিদ্যুৎ আসবে না।
আহ, কী কষ্ট! কী ভীষণ গরম! ঘামে গা ভিজে চপচপ করছিল।
নানি বেছুই দিয়ে যতক্ষণ বাতাস করতেন, ততক্ষণ একটু শান্তি লাগত। (আমাদের আঞ্চলিক ভাষায় হাতপাখাকে ‘বেছুই’ বলা হয়। কোথাও কোথাও বিজনি, বাওয়া, বেইনা কিংবা বাইনা নামেও পরিচিত।) নানি ঘুমিয়ে পড়লেই আবার গরমে আমার ঘুম ভেঙে যেত। রাতটা যেন শেষই হতে চাইছিল না।

সকাল হতেই ওযু করে তাড়াতাড়ি মক্তবের উদ্দেশে বের হলাম। আমরা খালের পাড় দিয়েই মক্তবে যেতাম। খালের উঁচু পাড়ে উঠে হঠাৎ দেখি—পুব আকাশ ঘন কালো মেঘে ছেয়ে গেছে। বাতাস ঠান্ডা। বড়ো বড়ো ফোঁটায় বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে। মনে হলো, আজ বুঝি সত্যিই বৃষ্টি নামবে।
ভূপৃষ্ঠের জলীয় বাষ্প ঘনীভূত হয়ে কালো মেঘের রূপে আকাশজুড়ে উড়ে বেড়াচ্ছে। মনে হচ্ছিল, এই কালো ছায়াগুলো আর নিজেকে ধরে রাখতে পারবে না; অচিরেই প্রশান্তির বৃষ্টিধারা হয়ে পৃথিবীর বুকে ঝরে পড়বে।
সেদিন আর মক্তবে যাওয়া হয়নি। খালের বাঁধ আর খেতের আঁকাবাঁকা আইল ধরে বাড়ির দিকে দৌড়াতে লাগলাম। বুকের ভেতর তখন বৃষ্টি নামার আনন্দ আর অদ্ভুত এক উচ্ছ্বাস। চারদিকে মানুষের হইহই চিৎকার। মাঝপথেই বৃষ্টি ধরে ফেলল। তখন আনন্দ যেন আরও বেড়ে গেল।
কথায় আছে—
শিশুদের কাছে বৃষ্টি মানেই আনন্দ,
কৈশোরে বৃষ্টি মানেই পাগলামি,
যৌবনে বৃষ্টি হয়ে ওঠে স্মৃতির জানালা,
আর বার্ধক্যে বৃষ্টি মানে একবুক ইতিহাস আর হারিয়ে যাওয়া দিনের দীর্ঘশ্বাস।
যাইহোক, দৌড়াদৌড়ি আর ছোটাছুটি করে আধভেজা শরীর নিয়ে ঘরে ফিরলাম। খালা গামছা দিয়ে শরীর মুছে দিতে দিতে বললেন,
—যাকগে, বৃষ্টি যেহেতু পড়ছে, ঘরে বসে পড়তে থাকো। কাজের ফাঁকে তোমার পড়া দেখব।
আমি কায়দাখানা হাতে নিয়ে জানালার পাশে গিয়ে বসলাম। বাইরে টুপটাপ বৃষ্টি পড়ছে। দূরের বাড়ির আঙিনার দূর্বা ঘাসগুলো বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে আরও সবুজ হয়ে উঠেছে। আমি জোরে জোরে পড়তে লাগলাম—
‘সোয়াদ লাম হা, বা সোয়াদ লাম…’
তবে সত্যি বলতে কী, তখন পড়ার চেয়ে বৃষ্টি দেখাতেই বেশি আমেজ ছিল। কিন্তু না পড়লে যে বকুনি খেতে হবে!
হঠাৎ জানালা দিয়ে দেখি—মামা বৃষ্টির মধ্যে ফুটবল হাতে দাঁড়িয়ে আছে। কখনো বলটা মাটিতে ছুড়ে মারছে, কখনো হাতে তুলে নিচ্ছে। হাতের ইশারায় আমাকে বাইরে ডাকছে। আমি আর দেরি করলাম না।
মাঠে গিয়ে দেখি, আমাদের দুই পাড়ার ছেলেরা ইতোমধ্যে মাঠে নেমে গেছে। তখনও খেলা শুরু হয়নি। কেউ ফুটবল শট দিয়ে আকাশে মারছে, কেউ হেড দিচ্ছে। কেউ চিৎকার করে বলছে,
—এই শাম, ম্যান ভাগ কর!

কেউ গোলপোস্টের সীমানা ঠিক করছে। আরেকজন বলছে,
—আজ রেফারি হবে বটকা মুস্তফা!
সবাই মজা করে মুস্তফাকে এ নামেই ডাকত।
বৃষ্টিতে তখন মাঠের দূর্বা ঘাসের গলা পর্যন্ত পানি। কাদামাখা মাঠ, ঝুম বৃষ্টি আর কিশোরদের উল্লাস—মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী জায়গাটা বুঝি ওই ছোট্ট মাঠটাই।বৃষ্টি থামছিল না। মনে হচ্ছিল, এত সহজে থামবেও না। আকাশ যেন বহুদিনের জমে থাকা কান্না একসাথে ঝরিয়ে দিচ্ছে।
আজ এত বছর পরও সেই দিনের কথা মনে পড়ে। সেই বৃষ্টিভেজা মাঠ, সেই সবুজ গাছের পাতায় টুপটাপ শব্দ, সেই কাদামাখা পা, সেই বন্ধুদের হাসি—সবকিছু এখনও বুকের ভেতর জীবন্ত হয়ে আছে।
সেই বন্ধুরা আজ কোথায়?
সেই মাঠ কি এখনও আছে?
সেই বৃষ্টিগুলো কি এখনও নামে আগের মতো?
নাকি শুধু বৃষ্টিই নামে, শৈশব আর নামে না!
সময় মানুষকে বড়ো করে দেয়, কিন্তু শৈশবকে ফিরিয়ে দেয় না। মাঝে মাঝে খুব ইচ্ছে করে—যদি এক দিনের জন্যও সেই অতীতে ফিরে যেতে পারতাম! তাহলে আর ফিরে আসতাম না। কারণ, জীবনের সবচেয়ে নির্মল সুখগুলো আমরা ফেলে এসেছি বৃষ্টিভেজা সেই শৈশবের ভেতরেই।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া