এক বৃষ্টিমুখর দিনে

আকাশ পাড়ায় আজ ভারি ব্যস্ততা| নিঃসীম আকাশের কোলজুড়ে থোকায় থোকায় পুঞ্জীভূত মেঘেরা আকাশ ভাঙা বৃষ্টির আয়োজন করছে খুব করে। গুরুম গুরুম শব্দে বৃষ্টির আগমনি বার্তা ধ্বনিত হচ্ছে আকাশে। বিদ্যুতের চোখ ধাঁধানো আলোর ঝলকানি পিলে চমকে দিচ্ছে বারবার ।

মোহাম্মদ হাফিজ উল্লাহ
পড়তে লাগবে 4 মিনিট

সকাল থেকেই পেঁজা তুলোর মতো গোত্রহারা মেঘেরা ভেসে বেড়াচ্ছিল আকাশের সীমানায়। মেঘেদের আনাগোনায় স্বাভাবিক পরিবেশটা হয়ে উঠতে লাগল ঘোরগ্রস্ত। হিম শীতল দখিনা বাতাস বৃষ্টির পূর্বাভাসকে প্রকটিত করে অনেকটা নিশ্চিতই করে দিলো—আজ বৃষ্টিমুখর দিন।

দুপুরের তপ্ত রোদেরা আজ ঘুমিয়ে পড়েছে চুলের মতো ঘন কালো মেঘের আড়ে। বৃষ্টিভেজা বাতাস বইছে পাগলা ঘোড়ার মতো ক্ষিপ্রগতিতে। বাতাসের তুড়ে বৃহদাকার বৃক্ষ পর্যন্ত ডানে বাঁয়ে মাথা ঝোঁকাতে বাধ্য হচ্ছে অসহায়ের মতো। এ যেন কোনো প্রলয়ঙ্করি ঝড়ের অশনি সংকেত। থেমে থেমে বাতাসের ঝাপটা লেপ্টে যাচ্ছে চোখে মুখে। এ শীতল বাতাস কেমন অদ্ভুত শিহরন জাগায় মনে-প্রাণে। শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে যায় একটি মৃদু কাঁপুনি।

দুপুরের যাবতীয় আলস্য ও ভ্যাপসা ভাবকে পাশ কাটিয়ে অবশেষে আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামল অঝোর ধারায়। একেকটা বৃষ্টিফোটা যেন মুক্তাদানা। কেমন স্বচ্ছ, নির্মল। দুধে ধোয়া সৌন্দর্যের এটাই বোধয় সর্বোৎকৃষ্ট উদাহরণ।
জানালার খিলটা খুলে দৃষ্টি ছড়িয়ে দিলাম বাহিরে। এ যেন প্রকৃতির উপচে পড়া যৌবনের নবরূপ। অপার সৌন্দর্যের অদ্ভুত সম্মোহন। হতবিহ্বল হয়ে বিস্ফারিত চোখে দেখলাম বিস্তীর্ণ মাঠের সবুজ ঘাসেরা যেন বৃষ্টির আগমনে নেচে নেচে উঠছে। টিনের চালায় বৃষ্টির পতনে রিনিঝিনি শব্দের তান উঠে। জোড়া নূপুর পায়ে নেচে চলা নর্তকীর ঝুমুরের চেয়েও এই আওয়াজ আরও বেশি ঘোরলাগা। বাতাসের বেগে বৃষ্টির খানিকটা ছাট এসে পড়ল চেহারায়। যেন সে আপন করতে চাইছে আমায়।

বৃষ্টি নামলেই ঘুমেরা ভিড় জমায় আমায় চোখের পাতায়। আজও এর ব্যত্যয় ঘটেনি। বৃষ্টির তীব্রতার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে ঘুমের প্রচণ্ডতা। নিজের সাথে অনেকটা বিদ্রোহ করেই জেগে থাকতে চাইলাম বৃষ্টির কোলাহলে। ব্যর্থ হলাম। চোখ জোড়াকে প্রবোধ দিতে পারলাম না কিছুতেই। অগত্যা কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লাম গুটিশুটি হয়ে। নিদ্রার কোলে গা এলিয়ে দিতেই হারিয়ে গেলাম ঘুমের অতলে। তন্দ্রা ভঙ্গ হলো ‘হাইয়া আলাস সলা’র মোহন সুরে।

সময়টা তখন বিকেল। বৃষ্টি থেমে গেছে অনেকক্ষণ আগেই। গোটা পরিবেশ কেমন থমথমে-নিস্তরঙ্গ। বৃষ্টি নেই। বাতাস নেই। মেঘ ডাকার গুরুম গুরুম শব্দ। পিলে চমকানো বিদ্যুৎ চমক আর বৃষ্টির সেই চিরাচরিত কোলাজও নেই। সবকিছুতেই গুমরে ফিরছে একরাশ নীরবতা। নামাজান্তে একাই হাঁটতে বের হলাম। পিচঢালা সড়কের কংক্রিট মাড়িয়ে এগোচ্ছি আর প্রকৃতির গভীর সম্মোহনে আন্দোলিত হচ্ছি। পথের ধারে অযত্নে বেড়ে ওঠা ফুল থেকে ধুয়ে গেছে যত ক্লেদ; এখন নজর কাড়ছে নবরূপে।

বৃষ্টিতে নেয়ে সবুজ প্রকৃতি হয়ে উঠেছে গাঢ় সবুজ। মুষড়ে পড়া পরিবেশে ছড়িয়ে পড়েছে প্রাণচঞ্চলতা। বাতাসে ভাসছে গ্রামীণ মাটির সোঁদা গন্ধ। কতকাল পড়ে যেন এই পাচ্ছে ফুসফুস!
ভিজে জবজবে কাকটা দেওয়ালের উপর বসে অহেতুক দৃষ্টি ফেলছে এদিন ওদিক। বৃষ্টির প্রকোপে আত্মরক্ষার্থে ফেরারি বিহঙ্গরা গলা ছেড়ে গান গাইতে শুরু করেছে। মেঘের চাদরে লুকানো বৃষ্টিস্নাত আকাশে মিষ্টি রোদের স্নিগ্ধ আভা ছড়িয়ে দেওয়ার কোশেশ করছে শেষ বিকেলের সূর্য। উপর্যুপরি মেঘের ভারি বর্ষণে সারা দুনিয়া যেন ধুয়ে মুছে নির্মল-নিষ্কলুষ স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ হয়ে গেছে।

কাননে সুরভিত ফুলেরা হয়ে উঠেছে আরও সুশোভিত। ফুলে ফুলে বর্ণের সমারোহ অনিন্দ্য সৌন্দর্যের সমীরণ গড়ে তুলেছে। কমনীয় রূপময় গোলাপের মসৃণ পাপড়ির ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে থাকা বৃষ্টি ফোঁটা চিকচিক করছে নরম রোদের হলদে আলোয়। মিহি সমিরণে মাথা দুলিয়ে মুচকি হাসছে কাননে সুরভিত ফুলেরা। তাদের অপার্থিব বিভায় মুগ্ধতার রেশ ছড়াচ্ছে রৌদ্রোজ্জ্বল ভূবনজুড়ে।

আমি হাঁটতে হাঁটতে এসে দাঁড়ালাম উল্লাসে বয়ে চলা খালের পাড়ে। নিত্য দিনের মরা খালে আজ কী প্রাণোচ্ছাস! তার যৌবন স্রোতে বৃষ্টির ক্লেদাক্ত জল খড়কুটো, পাতা-লতা ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে নদীর দিকে। খালের দুই পাড়ে জড়িয়ে থাকা সবুজের মখমল চাদরে স্নিগ্ধতার আবেশ খেলা করছে। আমি বিমুগ্ধ নয়নে তীব্র ভাবাবেশে মোহাবিষ্টের মতো উন্মুখ হয়ে তাকিয়ে আছি আকাশ, সবুজ ও প্রকৃতির দিকে। এই চিত্তাকর্ষক সৌন্দর্য হৃদয়গভীরে রেখাপাত করে। অপার ঐশ্বর্যে বিহ্বলতার রেশ যেন কাটতেই চায় না। আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো প্রণয়াবেশে ভাবি তার সুনিপুণ শৈলী নিয়ে। তার সৌকুমার্য আমায় বিস্ময়াভিভূত করে। ভালোবাসার চাদরে আচ্ছন্ন করে।

শিক্ষার্থী, জামিয়া দাওয়াতুল কুরআন ভূঁইগড়, ফতুল্লা, নারায়ণগঞ্জ

শেয়ার করুন
মন্তব্য নেই

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।