বৃষ্টির শুরুটা হয় খুব অদ্ভুতভাবে; একটা-দুটো ফোঁটা তপ্ত ধুলোয় পড়ে মিলিয়ে যায়, যেন তারা মাটির বুক চিনে নিচ্ছে। তারপরই শুরু হয় সেই ঝমঝম সুর। এই সুরের কোনো তাল নেই, লয় নেই, তবু এর চেয়ে বড়ো সংগীত আর পৃথিবীতে কী আছে? বৃষ্টির এই অবিরাম ধারার ভেতর দিয়ে তাকালে মনে হয়, সময় যেন থমকে দাঁড়িয়েছে।
জানালার পাশে বসে যখন দেখি কদম গাছটা তার সাদা পাপড়ি মেলে বৃষ্টির সবটুকু আদর মেখে নিচ্ছে, তখন বুকের ভেতরটা কেমন জানি হুঁ হুঁ করে ওঠে। মনে পড়ে যায় সেই ছোটবেলার কথা।
শৈশব মানেই তো ছিল বৃষ্টির দিনে এক অঘোষিত উৎসব। মেঘের ডাক শুনলেই স্কুলের খাতা ছিঁড়ে নৌকা বানানোর যে তোড়জোড়, তা কি আজকের এই বড়বেলার দামি গ্যাজেটে পাওয়া যায়? সেই ছোট্ট কাগজের নৌকাটি যখন উঠানের জমে থাকা কর্দমাক্ত জলে ভাসিয়ে দিতাম, মনে হতো ওটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড়ো জাহাজ, যা আমাকে নিয়ে যাবে রূপকথার কোনো অচিন দেশে।

বৃষ্টির তোড়ে যখন নৌকাটা ডুবে যেত, তখন মনটা খারাপ হতো ঠিকই, কিন্তু পরক্ষণেই আবার নতুন উদ্যমে নৌকা ভাসাতাম। ওই যে হার না মানার আনন্দ, ওই যে কাদার ভেতর গড়াগড়ি খেয়ে একাকার হওয়া—এসবই তো ছিল জীবনের আসল জৌলুস। বৃষ্টিতে ভিজে যখন সারা শরীর কাঁপত, তখন কোত্থেকে জানি মা এসে হাজির হতেন।
মায়ের সেই আদুরে শাসন, ‘এই ছেলে, এখনই ঘরে আয়, জ্বর বাধাবি তো!’—সেই ডাকের ভেতর যে কী পরিমাণ ভালোবাসা লুকিয়ে ছিল, তা আজ বড়ো একা থাকার দিনে খুব বেশি অনুভব করি। মা আঁচল দিয়ে মাথাটা মুছে দিতে দিতে বলতেন, ‘দেখ দেখি, বাঁদরটা কেমন কাকভেজা হয়েছে!’ তারপর রান্নাঘর থেকে ভেসে আসত ভাজা ইলিশ আর গরম খিচুড়ির সেই ¯স্বর্গীয় ঘ্রাণ। বৃষ্টির দুপুরে টিনের চালে ঝমঝম শব্দ আর মায়ের হাতের সেই তৃপ্তিকর খাবার—এই তো ছিল আমাদের সাদামাটা গ্রামীণ জীবনের পরম সুখ।
মাঝে মাঝে ভাবি, এই বৃষ্টির কোনো ভাষা আছে কি না। সম্ভবত নেই, কারণ ওটা সরাসরি হৃদয়ে আঘাত করে। গ্রামের সেই মেঠো পথ যখন কর্দমাক্ত হয়ে ওঠে, তখন সাধারণ মানুষের জীবন কিছুটা থমকে যায় ঠিকই, কিন্তু তাদের মনে জাগে এক অদ্ভুত তৃপ্তি। কৃষক যখন বৃষ্টির ঝাপটায় লাঙল কাঁধে বাড়ি ফেরে, তার ক্লান্ত চোখেও তখন হাসির ঝিলিক থাকে, কারণ সে জানে এই বৃষ্টিই তার ঘরে নবান্নের আনন্দ নিয়ে আসবে। আমাদের গ্রামীণ জীবনটা বড়ই অদ্ভুত, যেখানে মানুষের অভাব আছে কিন্তু মায়ার কোনো কমতি নেই।
বৃষ্টির রাতে যখন কুপি বা হারিকেনের আলোয় দাওয়ায় বসে ঠাকুমার কাছে ভূতের গল্প শুনতাম, তখন বাইরে বৃষ্টির শব্দটাকে মনে হতো কোনো অশরীরী আত্মার কান্নার মতো। ভয়ে তখন মায়ের কোল ঘেঁটে শুয়ে পড়তাম। বৃষ্টির সেই রাতগুলোতে যে কত রঙিন স্বপ্ন দেখতাম তার ইয়ত্তা নেই। স্বপ্নে দেখতাম মেঘের রাজ্যে মেঘপরিদের সাথে উড়ছি, অথবা কোনো এক গহিন বনে বৃষ্টির জল দিয়ে তৈরি এক প্রাসাদে আমি রাজা হয়ে বসে আছি। আজকের দিনে সেই ¯স্বপ্নগুলো ধূসর হয়ে গেছে, কিন্তু বৃষ্টির শব্দ শুনলেই অবচেতন মনে সেই পুরোনো ছবিগুলো আবার জীবন্ত হয়ে ওঠে।
সবচেয়ে বেশি মায়া লাগে যখন বৃষ্টির সাথে বিরহ মিশে যায়। যারা একা থাকে, যারা আপন মানুষকে হারিয়েছে, তাদের কাছে বৃষ্টি মানেই স্মৃতির আগল খুলে যাওয়া। বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা যেন একেকটা না বলা কথা হয়ে বুকে বিঁধতে থাকে। মনে হয়, পৃথিবীর সব জল বুঝি আজ আমার চোখ দিয়েই ঝরছে। তুমি কি জানো, বৃষ্টির দিনে একলা বসে এক কাপ চা আর জানালার গ্রিল ধরে তাকিয়ে থাকার ভেতর কতটা গভীর বিষাদ আছে? তখন মনে হয়, কেউ যদি একবার এসে পাশে দাঁড়াত, কেউ যদি আলতো করে হাতটা ধরে বলত—‘চলো, এই বৃষ্টিতে একসাথেই ভিজি’, তবে হয়তো একলা থাকার এই পাথরচাপা কষ্টটা কিছুটা হালকা হতো। কিন্তু কেউ আসে না। বৃষ্টি আসে, বৃষ্টি যায়, শুধু থেকে যায় স্মৃতির সেই ভেজা আল্পনা।

আসলে বৃষ্টি আমাদের শিখিয়ে দেয় যে, ঝরে যাওয়া মানেই শেষ হয়ে যাওয়া নয়; বরং নতুন করে বেঁচে থাকার নামই হলো বৃষ্টি। আকাশ থেকে ঝরে পড়া এই জল যেমন মাটিকে উর্বর করে, তেমনি আমাদের চোখের জলও হয়তো আমাদের হৃদয়কে এক গভীর উপলব্ধিতে সিক্ত করে তোলে।
বৃষ্টির এই দীর্ঘ আখ্যান আসলে শেষ হওয়ার নয়। যতবার আকাশ মেঘলা হবে, যতবার মাটির বুক সোঁদা গন্ধে ভরে উঠবে, ততবারই আমি আর তুমি ফিরে যাব সেই পুরোনো দিনে। বৃষ্টির সেই গান, সেই মায়া, মায়ের সেই ভালোবাসা আর শৈশবের সেই রঙিন ¯স্বপ্নগুলো—সবই তো আমাদের বেঁচে থাকার রসদ।
মাঝেমধ্যে ইচ্ছে করে সব যান্ত্রিকতা ফেলে সেই বৃষ্টিতে ভিজে একাকার হতে, যেখানে কোনো শাসন নেই, কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। শুধু আছে আমি, আমার বৃষ্টি আর একরাশ অবুজ আবেগ। বৃষ্টি মানেই তো জীবনের ছন্দ, বৃষ্টি মানেই তো বেঁচে থাকার আনন্দ।
তাই যখনই আকাশ কালো করে বৃষ্টি নামবে, তুমি শুধু একবার চোখ বন্ধ করে হূদয় দিয়ে অনুভব করো—দেখবে, তুমি আর একা নও, পুরো পৃথিবী তোমার সাথে একাকার হয়ে কাঁদছে, হাসছে আর ভালোবাসছে।
বোদা বাজার, পঞ্চগড়